
মো আবদুল করিম সোহাগ
অভিনয়কে শুধু পেশা নয়, জীবনের অন্যতম বড় ভালোবাসা হিসেবে দেখেন অভিনেতা, মডেল ও নাট্যকর্মী এমএইচএস লাবন। দীর্ঘদিনের থিয়েটারচর্চা, অভিনয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এবার বড় একটি স্বীকৃতি পেলেন তিনি। ‘ফেস অব টুমরো ২০২৬’-এর চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন লাবন।
মার্কেটার্স ৩৬০ ডিগ্রি ও ৩৬০ ডিগ্রি সিনেমার আয়োজনে ‘ফেস অব টুমরো’ সাজানো হয়েছে নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের খুঁজে বের করা এবং তাঁদের পেশাদার কাজের সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে নির্বাচিত শীর্ষ ২০ প্রতিযোগীকে নিয়ে নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা ও প্রস্তুত করা হয়েছে ১০টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ১০ জন নির্মাতার সঙ্গে এসব চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগীদের শুধু প্রতিযোগী হিসেবে নয়, সম্ভাবনাময় অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেদের প্রমাণের সুযোগও তৈরি হয়েছে। গ্র্যান্ড সিনেমাটিক গালা নাইটে চলচ্চিত্রগুলোর গল্প, পরিচালক, লোকেশন ও প্রধান জুটির পরিচয় তুলে ধরা হয়। সেই যাত্রার শেষ ধাপে চ্যাম্পিয়নের মুকুট ওঠে লাবনের মাথায়।
তবে এই অর্জন তাঁর কাছে হঠাৎ পাওয়া কোনো সাফল্য নয়। অভিনয়জীবনের শুরু থেকেই থিয়েটারকে তিনি নিজের শেখার অন্যতম প্রধান জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। হাইনার মুলারের ‘হ্যামলেট-মেশিন’-এ হ্যামলেট চরিত্রে অভিনয় তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ অভিজ্ঞতা। প্রযোজনাটি ‘ইশরাত নিশাত নাট্য পুরস্কার ২০২৩’-এ বিশেষ স্বীকৃতিও অর্জন করে। থিয়েটারে তাঁর সর্বশেষ অভিনীত নাটক হেনরিক ইবসেনের ‘হোয়েন উই ডেড অ্যাওয়েকেন’, যেখানে তিনি রুবেক চরিত্রে অভিনয় করেন।
অভিনয়ের পথে লাবন শিখেছেন গাজী রাকায়েত, নওরিন সাজ্জাদ ও তারিক আনাম খানের মতো গুণী শিল্পীর কাছ থেকে। পাশাপাশি তৌকির আহমেদ, নুরুল আলম আতিক, মেজবাউর রহমান সুমন, মাসুদ হাসান উজ্জ্বল, গিয়াস উদ্দিন সেলিম ও মহিউদ্দিন শাকেরসহ আরও অনেক নির্মাতা ও অভিনয়শিক্ষকের কাছ থেকেও শেখার সুযোগ পেয়েছেন। তবে নিজের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় গাইড হিসেবে লাবন নিজেকেই দেখেন। নিজের ভুল খুঁজে বের করা, সীমাবদ্ধতা বোঝা এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে আরও ভালো অভিনেতা হিসেবে তৈরি করার দায়িত্ব তিনি নিজেই নিয়েছেন।
নিজেকে আরও পরিণত অভিনেতা হিসেবে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে স্ক্রিন অ্যাক্টিং নিয়ে পড়াশোনা করেন লাবন এবং প্রতিষ্ঠানটির সপ্তম অভিনয় ব্যাচে প্রথম হন। অভিনয়ের পাশাপাশি অ্যাকাউন্টিং বিভাগ থেকে বিবিএও সম্পন্ন করেছেন তিনি।
তবে তাঁর পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালের ‘দীপ্ত স্টার হান্ট’-এ ফাইনাল পর্যন্ত এগিয়েও কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত অর্জন পাননি। এর আগে ২০২৪ সালে ‘মিস্টার অ্যান্ড মিস গ্ল্যামার লুকস’-এ ‘বেস্ট ট্যালেন্ট’ পুরস্কার অর্জন করলেও সামনে এগোনোর পথ সহজ হয়নি। সীমিত সুযোগ, ব্যর্থতা ও নানা বাধার মধ্যেও থেমে যাননি তিনি। বরং প্রতিটি ধাক্কাকে নিজের জন্য নতুন করে শেখার সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন।
লাবনের কাছে অভিনয় শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো বা জনপ্রিয়তা অর্জনের বিষয় নয়। এটি তাঁর কাছে নিজেকে প্রতিনিয়ত একজন শিল্পী হিসেবে তৈরি করার প্রক্রিয়া। জীবনের অন্য কোনো পড়াশোনায় হয়তো কখনো ফাঁকি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অভিনয় শেখার ক্ষেত্রে আপস করতে পারেননি তিনি। ভবিষ্যতে এমন একজন অভিনেতা হয়ে উঠতে চান, যাঁর কাজ দেখে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা অনুপ্রাণিত হবে। একই সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত স্বপ্ন, তাঁর বাবা-মা এবং তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখা মানুষগুলো যেন তাঁকে নিয়ে গর্ব করতে পারেন।
‘ফেস অব টুমরো ২০২৬’-এর বিজয় তাই লাবনের কাছে শুধু একটি শিরোপা নয়, বরং তাঁর দীর্ঘ অভিনয়যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সামনে এসেছে আরও বড় পরিসরে কাজের সুযোগ। নির্মাতা জাহিদ প্রীতমের ‘উইশলিস্ট’-এ ‘তুর্য’ চরিত্রে কাজের সুযোগও পেয়েছেন তিনি, যেখানে তাঁর বিপরীতে রয়েছেন মুনমুন বিশ্বাস মুন। ফলে এই মুকুট তাঁর জন্য একটি নতুন পেশাদার অধ্যায়ের সূচনাও।
এই জয়কে নিজের একার জয় হিসেবে দেখতে চান না লাবন। তিনি এটি উৎসর্গ করতে চান সেই সব সংগ্রামী অভিনেতাকে, যারা সীমিত সুযোগের মধ্যেও সততা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের সঙ্গে নিজেদের তৈরি করে চলেছেন। তাঁর বিশ্বাস, স্বীকৃতি পেতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস ও কাজের প্রতি সততা ধরে রাখলে একদিন না একদিন পথ তৈরি হয়।
অভিনয় ও মডেলিংয়ের বাইরে লেখালেখির প্রতিও লাবনের গভীর আগ্রহ রয়েছে। গল্প, কবিতা এমনকি গানও লেখেন তিনি। নিজের এই সৃষ্টিশীল দিকটি অবশ্য অনেকটা আড়ালেই রাখতে পছন্দ করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তার আরেকটি নীরব অধ্যায়।
এই দীর্ঘ যাত্রায় ‘ফেস অব টুমরো ২০২৬’-এর চ্যাম্পিয়ন হওয়াকে লাবন দেখছেন আরও বড় স্বপ্নের শুরু হিসেবে। একই সঙ্গে তিনি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ফেস অব টুমরো, মার্কেটার্স ৩৬০ ডিগ্রি ও ৩৬০ ডিগ্রি সিনেমার প্রতি। তাঁর মতো একজন শিল্পীর প্রতি আস্থা রেখে এত বড় একটি প্ল্যাটফর্মে নিজের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া এবং এই গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের অংশ করে নেওয়ার জন্য তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ লাবন। তাঁর কাছে এই আস্থা ও স্বীকৃতি অভিনয়জীবনের এমন একটি স্মৃতি, যা তিনি দীর্ঘদিন মনে রাখবেন।
থিয়েটারের মঞ্চ থেকে ফেস অব টুমরোর চ্যাম্পিয়ন হওয়া তাই শুধু একটি মুকুট পাওয়ার গল্প নয়; এটি সীমিত সুযোগকে পেছনে ফেলে নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে একজন শিল্পী হয়ে ওঠার যাত্রা। আর এই মুকুট কোনো শেষ নয়, বরং আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস পাওয়ার শুরু।