
নয়ন নাথ, ফটিকছড়ি
চান্দ্রাখীলের শিশির ভেজা সকালে, এক কন্যা জেগে উঠেছিলো দীপ্ত আশ্বাস হয়ে। তাঁর চোখে ছিল অনন্ত মমতা, হাতে ছিল নিরাময়ের নিঃশব্দ ক্ষমতা।
সাদা এপ্রোনে মোড়া হৃদয়ের সেই সংবেদনা ছুঁয়েছে হাজার প্রাণ। তিনি চিকিৎসক, তিনি সংগঠক, তিনি এক নিরব বাতিঘর। ফটিকছড়ির রৌদ্রছায়া বেয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন সুদূর পৃথিবীর সম্মানমঞ্চে।
নাম তাঁর, #ডাঃ_প্রীতি_বড়ুয়া মানবতার শ্রেষ্ঠ কাব্য।
১৯৫৭ সালের ০৮ই মে ফটিকছড়ির চান্দ্রাখীল গ্রামে ভোরের শিশিরস্নাত আলো যখন ধানের শীষে ও চা-পাতায় ধরা দিচ্ছিল, ঠিক তখনই এক নবজাগরণের আলোকদ্যুতি নিয়ে জন্ম নেন একটি কন্যাশিশু—প্রীতি।
গ্রামের আকাশে তখন পাখির কলতান আর দূরের ছোট পাহাড় থেকে আসা একটানা ঝরনার ধ্বনি মিলে সৃষ্টি করেছিল এক গীতল পটভূমি। সে দিনে কেউ হয়তো কল্পনা ও করেনি, এই মাটির কন্যা একদিন হয়ে উঠবেন মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিবেদিত এক দীপ্ত প্রদীপ।
চান্দ্রাখীল এ যেন প্রকৃতি ও শান্তির এক যৌথ প্রতিচ্ছবি। ছোট ছোট পাহাড় যেন নিঃশব্দ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে গ্রামটিকে ঘিরে। তাদের কোল ঘেঁষে বিস্তৃত চা-বাগান, যার পাতায় সকালবেলা শিশির বিন্দুরা রুপার মত ঝকমক করে।
সমতলের দিকে তাকালে দেখা যায় শস্যগোলার বাংলাদেশ সবুজ ধানক্ষেতের বিস্তৃতি। এখানে ঋতুর হাওয়ায় দুলে ওঠে প্রকৃতি, আর মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় সংস্কৃতির গান।
ডাঃ প্রীতি বড়ুয়ার জন্ম এক শিক্ষিত ও মানবিক পরিবারে। পিতা বুদ্ধকিংকর বড়ুয়া ছিলেন এক গম্ভীর, সদাশয় মানুষ, যিনি নীতিবোধ আর সংযমে বিশ্বাসী। মাতা বাসন্তী বড়ুয়া, যিনি সমাজে “রত্নগর্ভা মা” হিসেবে স্মরণীয়, সন্তানদের ভিতরেই যেন রচনা করেছিলেন নিজের জীবনের পরিপূর্ণতা।
প্রীতির দাদু মাস্টার সুরেন্দ্র লাল বড়ুয়া ছিলেন গ্রামের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক যাঁর প্রজ্ঞা ও আদর্শ ছিল আশপাশের বহু পরিবারের অনুপ্রেরণা। তাঁর নামে পরিচিত তাঁদের পরিবারিক গৃহ “মাস্টার বাড়ি” আজও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।
শৈশবের প্রীতি ছিলেন একান্তই প্রকৃতির সন্তান, চোখে ছিল কৌতূহল, মনে ছিল প্রশ্ন, আর অন্তরে ছিল এক বোধ, মানুষের উপকারে কিছু করতে হবে। গ্রামবাংলার সেই ধুলো মাটিতে হাঁটতে হাঁটতে, সন্ধ্যার মশাল আলোয় পড়ার টেবিলে বসে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এক অনন্য পথচলার জন্য।
চান্দ্রাখীলের সবুজ ভোর, পাখির ডাক আর খোলা প্রান্তরের মাঝে জন্ম নেয়া সেই কন্যা যখন একটু একটু করে বড় হতে শুরু করলেন, তখন তাঁর চোখে ফুটে উঠতে লাগল নতুন এক দিগন্তের স্বপ্ন। শিক্ষাই হবে তাঁর মুক্তির সোপান, আর জ্ঞানই হবে তাঁর আত্মোপলব্ধির মূল ধ্যান।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন গ্রামের বিদ্যালয়ে। সেই স্কুলঘর টিনের চালা, কাঠের বেঞ্চ, আর খোলা জানালায় বাতাস ঢুকত অনর্গল। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে ও তিনি শিখতেন জীবনের পাঠ মানবিকতা, সহানুভূতি আর দায়িত্ববোধ। শিক্ষকরা বলতেন, “এই মেয়েটির চোখে আছে জিজ্ঞাসা, আর মনে আছে আগুন।”
শিক্ষায় তাঁর অগ্রগতি ছিল অবিরাম, আর তারই ধারাবাহিকতায় ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। তখন সময়টা ছিল আশির দশক,
নারীদের উচ্চশিক্ষায় আসা তখনো খুব সহজ ছিল না,
কিন্তু প্রীতি বড়ুয়া ছিলেন ব্যতিক্রম। গ্রাম থেকে শহরে এসে হোস্টেল জীবনে প্রথম দিকে অনেক কিছুই ছিল অচেনা, নতুন পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, একাকীত্ব।
কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে তিনি ১৯৮২ সালে এম.বি.বি.এস ডিগ্রি অর্জন করেন, এবং প্রমাণ করেন প্রচেষ্টা ও বিশ্বাস থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়।
তবে এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চতর জ্ঞান আহরণের জন্য ১৯৮৫ সালে থাইল্যান্ডের বিখ্যাত মাহিদোল বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, যেখানে D.T.M & H কোর্স সম্পন্ন করেন।
তাঁর প্রতিভা ও নিষ্ঠা দেখে তাঁকে দেওয়া হয় স্কলারশিপ, যার ফলে তিনি লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ থেকে বিশেষ ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ পান।
এইপর্ব ছিল তাঁর জীবনের আরেকটি উত্তরণ, বিদেশি মাটিতে নিজেকে প্রমাণ করার এক চ্যালেঞ্জ, যা তিনি অতিক্রম করেন আত্মবিশ্বাস আর অধ্যবসায়ের সহিত।
১৯৮৭ সালে তিনি বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জনস থেকে এম.সি.পি.এস ডিগ্রি লাভ করেন।
এরপর ১৯৯৬ সালে যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ হাসপাতাল ও নিউক্যাসেল ম্যাটারনিটি হসপিটাল থেকে মায়ের ও শিশুর স্বাস্থ্য বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিনি শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় থেমে থাকেননি, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন থাইল্যান্ড, লন্ডন ও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ফিটোম্যাটারনাল ট্রেনিং, পরিবার পরিকল্পনা ও স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিদ্যার নানা শাখায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে একজন পূর্ণাঙ্গ নারী ও শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলেন।
প্রীতি বড়ুয়া জানতেন শুধু ডিগ্রি নয়, দরকার মানুষের পাশে দাঁড়াবার মানসিকতা, প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সহানুভূতি। এই শিক্ষা তাঁকে বানিয়ে তোলে শুধু একজন চিকিৎসক নয়, বরং একজন মমতাময়ী মানুষ, যাঁর কাছে প্রতিটি রোগী একজন আপন।
জীবনের শিক্ষার অঙ্কুরোদ্গম হয় বিদ্যালয়ে, কিন্তু তার পূর্ণতা ঘটে কর্মজীবনের পথে, যেখানে জ্ঞান, আদর্শ ও সেবাবোধ মিলেমিশে গড়ে তোলে এক মানুষের সার্বিক সত্তা।
ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া ঠিক তেমনই এক যাত্রার আরোহী, যাঁর প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি নিঃশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে মানুষের কল্যাণের সঙ্গে। ১৯৮৪ সাল সদ্য এম.বি.বি.এস ডিগ্রি অর্জন করে তিনি চিকিৎসা সেবার প্রথম পাঠ নিতে প্রবেশ করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে,
মেডিকেল অফিসার হিসেবে। এটি ছিল তাঁর চিকিৎসক জীবনের প্রথম প্রহর। রোগীদের অসহায় মুখ, অসুস্থ শিশুর কান্না, কিংবা মায়েদের উদ্বিগ্ন দৃষ্টি, সবকিছু তিনি আত্মস্থ করতেন গভীর মমতায়। একজন চিকিৎসক হওয়ার আগে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন ভালো মানুষ, একজন শ্রোতা, একজন সহানুভূতিশীল সাথী।
পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা শেষে, ১৯৮৯ সালে তিনি যোগ দেন মেমন মাতৃসদন হাসপাতালে সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে। এই হাসপাতাল ছিল শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং তাঁর দ্বিতীয় গৃহ, তাঁর নৈঃশব্দ্য পূর্ণ মন্দির।
দীর্ঘ একত্রিশ বছর ১৯৮৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত, তিনি এখানে সততা, নিষ্ঠা ও মমতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। হাজার হাজার মায়ের হাতে তুলে দিয়েছেন নতুন প্রাণ, স্নেহে জড়িয়ে নিয়েছেন নবজাতকদের, এবং বেদনাহত পরিবারকে দিয়েছেন আশার আশ্রয়।
এই দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কেবল ডাক্তার ছিলেন না, ছিলেন এক পরামর্শদাতা, একজন আশ্রয়দাত্রী, একজন নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক।
হাসপাতালের প্রত্যেক কর্মী, নার্স, রোগী ও সহকর্মীরা তাঁকে জানতেন ডাঃ প্রীতি ম্যাডাম’ নামে, যার চোখে ছিল আত্মবিশ্বাস, মুখে ছিল শান্ত ভঙ্গি, আর হৃদয়ে ছিল এক গভীর ভালবাসা।
২০২০ সালের ১লা আগস্ট এক গৌরবোজ্জ্বল কর্মজীবনের ইতি টানেন অবসর গ্রহণের মাধ্যমে। কিন্তু এটি ছিল না তাঁর শেষ অবদান। বরং আজও তিনি চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখেন সেবার সেই অমল ধারাকে চালিয়ে যাচ্ছেন আপন মাধুর্যে।
ডাঃ প্রীতি বড়ুয়ার কর্মজীবন কেবল তাঁর চাকরি নয়, ছিল একটি দায়িত্ববোধের ধারাবাহিক অনুশীলন, যেখানে প্রতিটি রোগী ছিলেন আশীর্বাদ, প্রতিটি সেবা ছিল প্রার্থনার মতো পবিত্র।
চিকিৎসা সেবা, প্রজ্ঞা ও পেশাগত উৎকর্ষ, সবকিছুর মাঝে ও মানুষের জীবনে যে নরম, স্নিগ্ধ পরিসরটি থাকে, তা হলো পরিবার। ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া’র জীবনেও সেই পরিসরটি ছিল এক আশ্রয়ের মতো, ভালোবাসা, দায়িত্ব ও আন্তরিকতার মিলিত সংগীত।
১৯৮৪ সাল কর্মজীবনের শুরুর দিকেই তাঁর জীবন বাঁধা পড়ে এক চিরন্তন বন্ধনে বিবাহসূত্রে। তিনি বিবাহিত হন রাউজান উপজেলার উত্তর গুজরা ডোমখালী নিবাসী, সমাজসেবক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বাবু বিপিন বিহারী বড়ুয়া’র জ্যেষ্ঠপুত্র বাবু বাদল বরণ বড়ুয়া’র সঙ্গে।
এই বিবাহ ছিল কেবল দুটি পরিবারের মিলন নয়, বরং
ছিল দুটি মননের সম্মিলন, যেখানে মানবসেবার প্রতি নিষ্ঠা, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা ছিল কেন্দ্রীয় ধারা।
বাদল বরণ বড়ুয়া ছিলেন সমাজের অগ্রসার এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর সহৃদয়তা, প্রজ্ঞা ও সমাজসেবার নেশা ডাঃ প্রীতি বড়ুয়ার জীবনে যোগ করেছিল এক সমান্তরাল মাধুর্য।
তাঁদের সংসার ছিল পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা, শ্রদ্ধাবোধের একটি নিরালা বাগান, যেখানে কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝে ও ছিল নৈশালোকের মতো গভীর আলাপ, একে অপরের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি।
তাঁদের সংসারে এসেছে দুই পুত্র রত্ন, শাওন বড়ুয়া ও সাজন বড়ুয়া। বড় ছেলে শাওন এখন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পিতার মতোই ভদ্র, বিনয়ী ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন।
ছোট ছেলে সাজন বড়ুয়া কর্মরত আছেন সিটি ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে মা এর মতোই পরিশ্রমী ও আন্তরিক।
২০১৪ সালের ৬ই মার্চ ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া হারান তাঁর জীবনসঙ্গী বাদল বরণ বড়ুয়া’কে, এই এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি পরিবারের হাল ধরেন দৃঢ় হাতে।
সন্তানদের শিক্ষিত, সচেতন ও মানবিক করে তোলেন। তাঁর ভরসা, তাঁর মমতা, তাঁর আলোর রেখা হয়ে আজ ও সেই সংসার দাঁড়িয়ে আছে আত্মমর্যাদার দীপ্ত ছায়ায়।
ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া বিশ্বাস করেন সংসার কেবল দাম্পত্য নয়, তা এক আধ্যাত্মিক সংগঠন, যেখানে প্রত্যেকে সেবার, ভালোবাসার ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে নিজেকে খুঁজে পান নতুন করে।
যাঁরা কেবল নিজ জীবনকে সফল করে থেমে থাকেন না, বরং সমাজের কল্যাণে নিজেদের বিস্তৃত করেন, তাঁদের মধ্যেই জন্ম নেয় নেতৃত্ব।
ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া ঠিক তেমন একজন নারী, যাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে সমাজ পেয়েছে আলোকবর্তিকা, সংগঠন পেয়েছে দৃঢ় পথনির্দেশ।
চিকিৎসার পেশায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি যুক্ত
হন একাধিক পেশাগত ও সমাজসেবামূলক সংগঠনে। তাঁর নেতৃত্বশক্তি ও দায়বদ্ধতা তাঁকে করে তোলে শত সহস্র মানুষের আস্থার কেন্দ্রবিন্দু।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বি.এম.এ)-এর চট্টগ্রাম শাখায় তিনি ছিলেন কার্যকরী পরিষদের সম্মানিত সদস্য।
যেখানে তাঁর তত্ত্বাবধানে বহু স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে, সহকর্মীদের উন্নয়নে তিনি ছিলেন পরামর্শদাতা, সংগঠক ও সহমর্মী সাথী।
স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞদের সংগঠন অবস্টেট্রিকাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (OGSB)-এর চট্টগ্রাম শাখায় তিনি দায়িত্ব পালন করেন ট্রেজারার হিসেবে।
এখানে তিনি সংগঠনের আর্থিক স্বচ্ছতা, কার্যক্রমের গতিশীলতা এবং সদস্যদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর সংগঠকসত্তার আরেক অনন্য পরিচয় হলো বাংলাদেশ বৌদ্ধ চিকিৎসক সমিতি (BBDA)-এর সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা হিসেবে।
তাঁর নেতৃত্বে এই সংগঠন শুধু চিকিৎসা নয়, মানবসেবা ও ধর্মীয় মূল্যবোধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন, শিক্ষাবৃত্তি প্রদান এসবই তাঁর সংগঠক জীবনের জীবন্ত সাক্ষ্য।
ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া শুধু একজন নেতৃত্বদানকারী ছিলেন না, ছিলেন এক সহমর্মী কণ্ঠ যিনি সমতা ও মানবিকতার আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন।
তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের আজীবন সদস্য, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পেশাজীবী পরিষদের সাবেক সভাপতি, ভুজপুর ক্লাব এবং ভুজপুর ন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজীবন সদস্য।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর ভূমিকা ভুজপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর পরিচালক হিসেবে। এখানে তিনি নারী শিক্ষার প্রসারে গভীরভাবে নিয়োজিত থেকেছেন, নিজ গ্রামের মেয়েদের শিক্ষিত, আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী করে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন।
তিনি ট্রাস্টি ও পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন প্রান্তিক ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, বেলভিউ হাসপাতাল, রয়েল হাসপাতাল লিমিটেড, এবং ব্লু ভিউ হেলথ কেয়ার লিমিটেড-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র গুলিতে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই আজ তাঁর পরিকল্পনা ও সেবামূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এগিয়ে চলেছে স্থিতিশীল পথে।
এই অধ্যায় সাক্ষ্য দেয় যে, ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া একজন ‘অফিসার’ বা ‘ডিরেক্টর’ ছিলেন না কেবল, তিনি ছিলেন এক পাথেয়, এক প্রেরণা, যাঁর পথচলায় সংগঠন পেয়েছে দিশা, সমাজ পেয়েছে শক্তি।
কোনো কোনো মানুষের জীবন সীমান্তে আবদ্ধ থাকে না,
তাঁরা সীমার বাইরে গিয়ে অন্বেষণ করেন জ্ঞান, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতার অসীম মহাকাশ।
ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া তেমনই একজন যাত্রী যিনি শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরে গিয়েও ছড়িয়ে দিয়েছেন সেবার আলোকধারা।
প্রশিক্ষণ ও জ্ঞানার্জনের অন্বেষণে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাণকেন্দ্র থাইল্যান্ডের মাহিদল বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে অর্জন করেন DTM&H কোর্স।
এরপর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলভাবে সম্পন্ন করেন উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা, যা ছিল তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা ও আন্তর্জতিক মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবার প্রতি প্রতিশ্রুতির প্রতীক।
পরে কিংস কলেজ হাসপাতাল, নিউ ক্যাসেল মাতৃত্ব হাসপাতাল, লন্ডন কলেজ হাসপাতাল ও শ্রীরাজ হাসপাতাল, ব্যাংকক—এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানে তিনি যে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, তা তাঁকে বিশ্বমানের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলে।
কিন্তু তাঁর ভ্রমণ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রশিক্ষণমূলক
ছিল না, ছিল অভিজ্ঞতার বিস্তার। তিনি অংশগ্রহণ করেছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলনে, যেখানে তাঁর কণ্ঠে ছিল বাংলাদেশের নারী ও শিশু স্বাস্থ্য সেবার কথা, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে ছিল উন্নয়ন ও সহমর্মিতার বার্তা।
তাঁর পদচারণায় স্পর্শ পেয়েছে……
ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, লন্ডন, স্কটল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, নিউইয়র্ক, ভার্জিনিয়া, ফ্লোরিডা, হংকং ও ক্যালিফোর্নিয়া।
এই দেশগুলোতে তিনি চিকিৎসা সভা ও আলোচনায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে অংশ নিয়েছেন, সংলাপ করেছেন নারীর স্বাস্থ্য, মাতৃত্বকালীন নিরাপত্তা, পরিবার পরিকল্পনা ও মানবাধিকার বিষয়ে।
এই আন্তর্জাতিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন নানা সম্মাননা ও পুরস্কার—
১। ২০১৫ সালে International Buddhist Peace Organization of America, New York-এর পক্ষ থেকে “Appreciation Award for Contribution on Women Health” সম্মাননা।
২। ২০১৬ সালে মা ও শিশু মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কর্তৃক জয়িতা সম্মাননা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিভাগীয় পর্যায়ের এক বিশিষ্ট স্বীকৃতি।
৩। সুপ্রভাত বাংলাদেশ পত্রিকার পক্ষ থেকে বিশ্ব নারী দিবস-এ বিশেষ সম্মাননা।
৪। অমিতাভ প্রকাশনার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্বাস্থ্যসেবায় অনন্য অবদান এর জন্য সম্মাননা।
এছাড়াও দেশ-বিদেশের অসংখ্য সংগঠন তাঁর পেশাগত নৈপুণ্য ও সমাজসেবাকে সম্মান জানিয়ে ভূষিত করেছে নানা স্মারক ও পদকে।
এই অধ্যায়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় লেখা আছে এক নারীর সীমাহীন উত্থান, যাঁর জ্ঞানের বিস্তার ও সেবার চেতনা ছড়িয়ে গেছে দেশ থেকে বিদেশে, ভাষা থেকে সংস্কৃতিতে, মানবতা থেকে সম্মানে।
কিছু জীবন অক্ষরহীন থেকে ও হয়ে ওঠে এক মহাগ্রন্থ।
ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া’র জীবন তেমনই এক জীবন্ত দলিল যা শুধুমাত্র তাঁর কাজ বা পদমর্যাদায় নয়, প্রতিটি নিঃশ্বাসে বহন করে সেবার ব্রত, নেতৃত্বের জ্যোতি ও মানবিকতার দীপ্তি।
যে গ্রাম চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার চান্দ্রাখীল,
ছোট ছোট পাহাড়, চা-বাগান আর সবুজ ধানক্ষেতের মাঝে ছিল যেন প্রকৃতির আপন কোলে গড়া এক আত্মিক জগৎ, সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর যাত্রা।
সেই গ্রামের নরম মাটির ঘ্রাণ, শিক্ষার প্রতি পারিবারিক নিষ্ঠা, আর সেবার প্রতি উত্তরাধিকারী অনুভব তাঁকে বানিয়েছিল ভবিষ্যতের দিশারি।
ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া শুধু একজন সফল চিকিৎসক নন, তিনি এক আদর্শ। তাঁর হাত ধরে অসংখ্য মায়ের মুখে ফিরেছে হাসি, বহু শিশুর জীবন পেয়েছে নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
তিনি ছিলেন একজন ‘মেডিকেল অফিসার’ থেকে শুরু করে, একজন ‘লিডার’ হয়ে ওঠার জ্যোতির্ময় উদাহরণ।
তাঁর শিক্ষা ছিল সমাজের জন্য, অর্জন ছিল জনগণের কল্যাণে নিবেদিত। তাঁর সংগঠনপ্রিয়তা ও নেতৃত্ব আজও অসংখ্য প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার অভিমুখ দেখায়।
তাঁর পারিবারিক জীবন ছিল এক স্নেহশীল আশ্রয়স্থল, যেখান থেকে সন্তানরা পেয়েছে আত্মমর্যাদার শিক্ষা।
ডাঃ প্রীতি বড়ুয়া বিশ্বাস করেন, প্রতিটি জীবনই একটি মশাল, যা আলোকিত করে চারপাশ। সেই মশাল কেবল নিজের জন্য নয়, আশেপাশের মানুষদের জন্য জ্বলে উঠতে জানলে তবেই তা হয়ে ওঠে অনন্য।
এই বিশ্বাসেই তিনি আজও প্রতিদিন নিয়ম করে রোগী দেখেন তাঁর চেম্বারে, কথা বলেন ভালোবাসার ভাষায়, পাশে দাঁড়ান মানুষদের, নতুন দিনের আশা হয়ে।
তিনি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন, নারী মানে কেবল ঘর নয়, নারী মানে আলো, নেতৃত্ব, সাহস ও করুণার মূর্তি। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আজ পরিণত হয়েছে ভবিষ্যতের একটি মানচিত্রে, যেখানে নতুন প্রজন্ম খুঁজে পাবে পথের দিশা।
এমন মানুষরা মৃত্যুহীন হন। তাঁরা বেঁচে থাকেন প্রতিটি প্রার্থনায়, ভালোবাসায় ও কৃতজ্ঞতায়।