
লেখক: লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া
পূর্ণিমার আলো যুগে যুগে মানুষের হৃদয়ে সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও আশার প্রতীক হয়ে জ্বলেছে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে আষাঢ়ী পূর্ণিমা কেবল একটি চন্দ্রালোকিত রজনী নয়; এটি মানবজাতির ইতিহাসে এক মহিমান্বিত আধ্যাত্মিক অধ্যায়ের সূচনা। এই একটি পূর্ণিমা তিথিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে বুদ্ধজীবনের তিনটি অনন্য ঘটনা; তুষিত স্বর্গ থেকে বোধিসত্ত্বের অবতরণ ও মহামায়া দেবীর গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ, রাজকুমার সিদ্ধার্থের মহাভিনিষ্ক্রমণ তথা গৃহত্যাগ এবং সম্যক সম্বুদ্ধ হওয়ার পর সারনাথে প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন। এই তিনটি ঘটনাই মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনন্তকাল ধরে প্রজ্ঞা, করুণা ও মুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে।
যখন পৃথিবী অন্যায়, হিংসা, লোভ ও অবিচারে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখনই মহাকরুণিক বোধিসত্ত্ব মানবকল্যাণের সংকল্প গ্রহণ করেন। তুষিত স্বর্গ থেকে তিনি অবতীর্ণ হন পূণ্যবতী রানী মহামায়ার গর্ভে। শ্বেতহস্তীর অলৌকিক স্বপ্ন শুধু একটি ধর্মীয় কাহিনি নয়; এটি বিশ্বমানবের অন্তরে কল্যাণ, পবিত্রতা ও নবজন্মের প্রতীক। আষাঢ়ী পূর্ণিমার সেই পবিত্র প্রতিসন্ধি মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়; যখন অন্ধকার গভীর হয়, তখনই আলো জন্ম নেয়।
রাজকুমার সিদ্ধার্থের জীবন ছিল রাজকীয় ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ। কিন্তু বিলাসিতা তাঁর মনকে স্পর্শ করতে পারেনি। জরা, ব্যাধি, মৃত্যু ও সন্ন্যাসীর দর্শন তাঁর হৃদয়ে এমন প্রশ্নের জন্ম দেয়, যার উত্তর কোনো রাজ্য, ক্ষমতা কিংবা সম্পদ দিতে পারে না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন; জীবনের প্রকৃত জয় ভোগে নয়, সত্যের অনুসন্ধানে।
আষাঢ়ী পূর্ণিমার গভীর রাতে, যখন সমগ্র রাজপ্রাসাদ নিদ্রামগ্ন, তখন ইতিহাসের এক অনন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি। প্রিয় পিতা, স্নেহময়ী মাতৃসম মহাপ্রজাপতি গৌতমী, সহধর্মিণী যশোধরা, শিশু পুত্র রাহুল, রাজ্য, ক্ষমতা ও সমস্ত পার্থিব সুখ ত্যাগ করে তিনি বেরিয়ে পড়েন মানবদুঃখের অবসান খুঁজতে। এই ত্যাগ কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য আত্মোৎসর্গের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। তাই আষাঢ়ী পূর্ণিমা আমাদের শেখায়; মহৎ আদর্শ অর্জনের জন্য কখনও কখনও ব্যক্তিগত সুখকে বিসর্জন দিতে হয়।
ছয় বছরের কঠোর তপস্যা, ধ্যান ও আত্মসংযমের পর বোধিবৃক্ষতলে সম্যক সম্বুদ্ধত্ব লাভ করেন তিনি। এরপর সারনাথের ঋষিপতন মৃগদায়ে আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিনেই পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদের উদ্দেশ্যে প্রথম ধর্মদেশনা প্রদান করেন, যা ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র নামে অভিহিত। এই ধর্মচক্র প্রবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয় মধ্যম প্রতিপদ, চার আর্যসত্য ও অষ্টাঙ্গিক মার্গের মহান দর্শন। মানুষের দুঃখের কারণ, দুঃখ থেকে মুক্তির উপায় এবং মুক্তির পথকে তিনি এমন সহজ ও যুক্তিনির্ভর ভাষায় ব্যাখ্যা করেছিলেন, যা আজও বিশ্বমানবের পথপ্রদর্শক।
আষাঢ়ী পূর্ণিমা বর্ষাবাসেরও সূচনা। এই দিন থেকে তিন মাস ভিক্ষুসংঘ নির্দিষ্ট বিহারে অবস্থান করে ধ্যান, অধ্যয়ন ও ধর্মচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। উপাসক-উপাসিকারাও দান, শীল, ভাবনা, উপোসথ পালন ও সৎকর্মের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির অনুশীলন করেন। এই বর্ষাবাস আমাদের শেখায়; মানুষের জীবনে যেমন কর্ম প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, নীরবতা ও অন্তরের পরিশুদ্ধি।
আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও মানবিকতায় নানা সংকটে নিমজ্জিত। যুদ্ধ, সহিংসতা, বিদ্বেষ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, পরিবেশ বিপর্যয়, লোভ ও আত্মকেন্দ্রিকতা আমাদের সভ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আষাঢ়ী পূর্ণিমার শিক্ষা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছেন- ঘৃণার জবাব ঘৃণায় নয়, মৈত্রীতে; প্রতিশোধে নয়, ক্ষমায়; লোভে নয়, ত্যাগে; বিভাজনে নয়, সহমর্মিতায়।
বুদ্ধের করুণার দর্শন কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বা সম্প্রদায়ের সম্পদ নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক সার্বজনীন জীবনবোধ। তাই আষাঢ়ী পূর্ণিমার মাহাত্ম্যও সীমাবদ্ধ নয় কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে। এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে মানুষের চরিত্র গঠনে, নৈতিকতার বিকাশে, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চায়।
আজ প্রয়োজন বাহ্যিক উৎসবের পাশাপাশি অন্তরের উৎসব। প্রয়োজন নিজের হৃদয়ের অন্ধকার দূর করে সত্য, প্রজ্ঞা ও করুণার প্রদীপ প্রজ্বলিত করা। যদি আমরা বুদ্ধের শিক্ষা থেকে সামান্যও গ্রহণ করতে পারি, তবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র; সবখানেই শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
আষাঢ়ী পূর্ণিমার শুভক্ষণে আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি; লোভের পরিবর্তে দান, বিদ্বেষের পরিবর্তে মৈত্রী, প্রতারণার পরিবর্তে সত্য, হিংসার পরিবর্তে অহিংসা এবং স্বার্থপরতার পরিবর্তে মানবসেবাকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করব। এটাই হবে বুদ্ধের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা, এটাই হবে আষাঢ়ী পূর্ণিমার সর্বোত্তম উদ্যাপন।
শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমার পবিত্র আলো প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলুক প্রজ্ঞা, করুণা ও কল্যাণের দীপশিখা। বিশ্ব হোক শান্তির, মানুষ হোক মানবতার, আর প্রতিটি হৃদয় হয়ে উঠুক বোধির আলোয় আলোকিত।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।।
লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও সংগঠক; ভাইস প্রেসিডেন্ট, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফূলী এলিট।