
আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় বিএনপি এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে,তখনই দলটিতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও কোন্দল বাড়ছে। যা সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ওপর বড় আঘাত হানতে পারে।
দলের নীতিনির্ধারকরা বলছেন,নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলে একই এলাকা থেকে বিএনপির একাধিক নেতা প্রার্থী হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই নিজেকে দলের সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে দাবি করতে পারেন। এতে দলের সমর্থন বিভক্ত হতে পারে,পছন্দের প্রাথী দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরা সুবিধা পেতে পারেন।
বর্তমানে দুই উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে বেশি সরব। চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর নভেম্বর থেকে ইউপি নির্বাচন শুরু হতে পারে। স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য বড় কাঁটা হবে বিদ্রোহী প্রার্থী ও মৌসুমি প্রতিযোগী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,ইউপি নির্বাচনে সরকারি দলকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তার মধ্যে সবচেয়ে জরুরি একক প্রার্থী নিশ্চিত করা,দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থী দমন।
বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে ইউপি নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী বাছাইয়ে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। এ বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। যেসব ইউনিয়ন পরিষদ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে,সেগুলোতে আগে নির্বাচন হবে। তবে দলীয় প্রতীক না থাকায় সম্ভাব্য ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও নিজেদের মধ্যে কলহ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বিএনপির ভেতরে।
সবশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নিয়ে তারই আভাস মিলেছে। এদিন দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পৃথকভাবে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে নেতাকর্মীরা। আনোয়ারার ১১টি ইউনিয়ন ও কর্ণফুলীর ৫টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে দুই বা ততধিক বিএনপির প্রার্থী সক্রিয় আছেন। সবাই চেয়ারম্যান প্রার্থী। আর মেম্বার প্রার্থীর তো হিসেবই নেই। সবাই বিএনপির ব্যানারে প্রচারণা চালাচ্ছেন নিজ নিজ এলাকায়।
বিপরীতে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী প্রত্যেক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে একজন। তারা নিজেদের মধ্যে অঘোষিত প্রার্থী মনোনীত করে রেখেছে। তাদের জন্য জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। বিএনপি এবং জামায়াত ছাড়াও আওয়ামী লীগের কিছু প্রার্থীও অনলাইন মাধ্যমে সরব হয়েছেন। তারা স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। তবে তারা নিজেদের দলীয় পরিচয়কে সামনে আনছেন না।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন বলেন,দলীয় সুবিধা দিয়ে কাউকে জিতিয়ে আনার সুযোগ নেই। কাজ করেই নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। দলের প্রার্থী থাকবে একজনই। দলের জন্য যার ত্যাগ ও এলাকায় জনসমর্থন বেশি,তাকেই মনোনীত করা হবে। আসন্ন ইউপি নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আমলনামা ভারি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই নেতা।
গত ৩০ আগস্ট বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রস্তুতি সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন,যার জনসমর্থন বেশি,দল তাকেই মনোনয়ন দেবে। দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে ঠেকাতে বিরোধী পক্ষ চেষ্টা করতে পারে উল্লেখ করে তিনি দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহবান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,ইউপি নির্বাচনে শুধু দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর পারিবারিক ঐতিহ্য,জনসেবা, ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। এই নির্বাচনে উপযুক্ত প্রার্থী নির্ধারণ ও স্থানীয় বিরোধ মেটাতে পারলে বিএনপি অত্যন্ত শক্তিশালী ফল অর্জন করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো.এনায়েত উল্লাহ পাটওয়ারী বলেন,‘সরকারি দলে সুবিধাভোগী ও অংশীজনের ভিড় বেশি থাকে। সে জন্য দলের মধ্যে প্রতিযোগী বেশি দেখা যায়। এতে ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। স্থানীয় নির্বাচনে এসব কারণে বিরোধী দল সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে। আমি মনে করি সরকারি দলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো।’
এদিকে,স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারী দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
রুুহুল কবির রিজভী বলেন,‘আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে কারা প্রার্থী হবেন,তা স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামত ও প্রার্থীদের যোগ্যতা বিবেচনা করা হবে।’