
– লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর চট্টগ্রাম—পাহাড়ের সবুজ আর সাগরের নীলের অপূর্ব সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এক মনোমুগ্ধকর নগরী। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় নগরীর একটি দীর্ঘদিনের দুঃখগাঁথা হলো জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুম এলেই নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক, অলিগলি এমনকি বাসাবাড়িও পানিতে তলিয়ে যায়, যা কেবল একটি প্রাকৃতিক সমস্যা নয়, বরং আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
প্রথমত, চট্টগ্রামের ভৌগোলিক গঠন জলাবদ্ধতার একটি বড় কারণ। পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক জলাধার ভরাটের ফলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নগরীর খালগুলো একসময় বৃষ্টির পানি দ্রুত সাগরে পৌঁছে দিত, কিন্তু আজ অধিকাংশ খাল দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার শিকার। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে থাকে দীর্ঘ সময়।
দ্বিতীয়ত, ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক এলাকায় নালা-নর্দমা অপর্যাপ্ত, আবার কোথাও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যে নালা বন্ধ হয়ে পানি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটে। নগরবাসীর অসচেতন আচরণও এ সমস্যাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা যেন একটি নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। খাল পুনঃখনন, ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প চলমান থাকলেও বাস্তবায়নে ধীরগতি, সমন্বয়ের অভাব এবং দীর্ঘসূত্রতা সমস্যা সমাধানকে বিলম্বিত করছে। অনেক সময় প্রকল্পের কাজ চলাকালীনই জনদুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
এ সমস্যার উত্তরণে সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, নগরীর সকল খাল ও জলাধার দখলমুক্ত করে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক ও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা ভারী বৃষ্টিপাত সামাল দিতে সক্ষম। তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনায় পরিবেশগত দিকগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে—বিশেষ করে পাহাড় কাটা ও জলাধার ভরাট বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য বিষয় হলো জনসচেতনতা; এটি শুধু একটি শব্দ নয়, বরং একটি সম্মিলিত দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না; যত বড় প্রকল্পই গ্রহণ করা হোক, যদি আমরা নিজেরা সচেতন না হই, তবে সব প্রচেষ্টা একসময় ভেস্তে যাবে। আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট অবহেলাই বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়; যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, প্লাস্টিক নালায় নিক্ষেপ, খাল দখল কিংবা পরিবেশের প্রতি উদাসীনতা, এসবই জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাকে আরও তীব্র করে তোলে।
এখনই সময় নিজেদের বদলানোর, শহরকে নিজের ঘর ভেবে যত্ন নেওয়ার। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা, পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হওয়া এবং নগরের সৌন্দর্য ও সুশৃঙ্খলতা বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা; এসব কোনো অতিরিক্ত দায়িত্ব নয়, বরং নাগরিক হিসেবে আমাদের নৈতিক কর্তব্য। যদি আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এক ধাপ এগিয়ে আসি, তবে সম্মিলিত এই সচেতনতা এক শক্তিশালী পরিবর্তনের স্রোত তৈরি করতে পারে। সেই স্রোতই একদিন চট্টগ্রামকে শুধু জলাবদ্ধতামুক্তই করবে না, বরং গড়ে তুলবে একটি পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও গর্ব করার মতো নগরী হিসেবে।
সবশেষে বলা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা সমস্যা আজ আর অমীমাংসিত নয়, বরং এটি কার্যকর বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা একটি সমাধানযোগ্য চ্যালেঞ্জ। খাল পুনঃখনন, ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত চলমান প্রকল্পগুলো যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং পরবর্তীতে সেগুলোর ওপর কঠোর ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা হয়, তবে এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে নগরবাসী স্থায়ীভাবে মুক্তি পেতে পারে। প্রয়োজন কেবল সমন্বিত উদ্যোগ, জবাবদিহিমূলক কার্যক্রম এবং আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালনের মানসিকতা। তখনই বাস্তবে রূপ নেবে একটি জলাবদ্ধতামুক্ত, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য চট্টগ্রাম নগরীর প্রত্যাশা।
লেখক পরিচিতি : কলাম লেখক ও সংগঠক; সেক্রেটারী, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট।