
লেখক-মাওঃ এস, এম রবিউল হোছাইন, সুফি ও আকিদা গবেষক
ইসলামে সম্মানিত মুরব্বীদের সালাম দেওয়া, পা ছুঁয়ে সালাম করা, কদমবুসি বা হাতে -পায়ে চুমু খাওয়া, সজিদায়ে তাহিয়্যা করা সবগুলো আদব-শিষ্টাচার সম্মানের অন্তর্ভুক্ত। মুরব্বি, উস্তাদ, পীর-মুর্শিদ, মাতা-পিতা, নবী (দ:)-উম্মতসহ পাঁচজনকে
অভিবাদন বা সম্মান জানোনোর জন্য করা
হয়। কেউ আসসালামু আলাইকুম বলে, কেউ পায়ে ছুঁয়ে সালাম করে, কেউ কদমবুসি বা হাতে-পায়ে চুমু খেয়ে, কেউ মস্তকবনত হয়ে বুজুর্গ বা সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান বা সালাম করে থাকেন।
সালাম করা ও কদমবুসি করা সরাসরি হাদিস ও আছার দ্বারা প্রমাণিত সুন্নত, যা ইমাম বুখারী (রা:) এঁর “আদাবুল মুফরাদ” ও আবু দাউদ গ্রন্থসহ বিভিন্ন ছহি হাদিস গ্রন্থে উল্লেখ আছে। অনেকে না বুঝে শিরিক বা হারাম বলে থাকেন। সিজদা দুই প্রকার:
(এক): এবাদতের সিজদা(দুই): সিজদায়ে তাহিয়্যা। এবাদতের সিজদা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে দেওয়া কুফুরি ও শক্তভাবে হারাম৷ আর সম্মানী সিজদা নিয়ে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, সম্মানী সজিদা পীরের কদমে বা পীরের মাজারে সালামের স্থলাভিষিক্ত হিসাবে অধিক ঝুঁকে মস্তকবনত করাকে সিজদায়ে তাহিয়্যা বলা হয়৷ আর তাযিমী সিজদা বা সম্মানী সিজদা পবিত্র কুরআন দ্বারা প্রমাণিত।
কিন্তু এ প্রকার সালাম, আদব বা সম্মান করা নিয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে এখতেলাফ বা মতানৈক্য রয়েছে। অনেক জাহেরী আলেমরা এটাকে নাজায়েজ বলেছেন। আবার অনেক মাশায়েখগণ এটাকে জায়েজ বলেছেন। আর কোন মাসআলায় মুজতাহিদগণের মতানৈক্য দেখা দিলে তাতে কোন পক্ষ ভুল বা গুনাহের হকুমে থাকেনা। উভয় পক্ষ সঠিক বলে গন্য হয়। পূর্ববর্তী সকল শরীয়তে সম্মানী সজিদা করা মুস্তাহাব হিসেবে রীতি-নীতি ছিল, আমাদের শরীয়তে এসে এটার মুস্তাহাবের হকুম রহিত করা হয়েছে।
কিন্তু ইহার ইবাহত বা জায়েজের হকুম বলবৎ রয়েছে৷ যেমন: আশুরা ও আইয়্যামে বীজের রোজা আগের শরীয়তে ফরজ ছিল, আমাদের শরীয়তে রমজান মাসের রোজার কারণে আশুরা আইয়ামে বীজের ফরজের হকুম মনসুখ হয়েছে কিন্তু মুস্তাহাব বা নফলের হকুম এখনো বলবৎ আছে, সম্মানী সিজদার হকুমও অনুরূপ।
পবিত্র কুরআন সুরা বাকারাহ’র ৩৪ নং আয়াত ও সুরা ইউসুফের ১০০ নং সহ মোট ১৪ টি আয়াতে ফেরেস্তাগণ কর্তৃক হযরত আদম (আঃ) কে ও হযরত ইউসুফ (আঃ) কে তার পিতামাতা ও এগারো ভাইয়ের যে সজিদার করার কথা বর্ণিত হয়েছে তা জমহুর বা অধিকাংশ মুফাচ্ছিরদের নিকট তাযিমী সিজদা বা সম্মানী সিজদা বলে পরিচিত ও আখ্যায়িত।
কিন্তু ১৪ টি আয়াত এর বিপরীতে একটা আয়াতও নাজিল হয়নি সম্মানী সিজদা করা যাবেনা এ মর্মে বা শরীয়তে মুহাম্মদীতে তা করা যাবেনা এ ধরনের কোন বর্ণনা কুরআনে আসেনি ৷
উসুলে ফিকহের কিতাব উসুলে বজদবী, নুরুল আনোয়ার কিতাবে স্পষ্ট উল্লেখ আছে- পূর্ববর্তী শরীয়তের কোন বিষয় কুরআনে বর্ণনা হলে তা দ্বীনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়৷ যদিও কুরআন শরীফের এসব আয়াতের বিপরীতে হাদিসের কিছু বর্ণনা দ্বারা অনেক জাহেরী আলেম মনসুখ বলে দাবি করেন। হাদিসগুলো কিন্তু খবরে ওয়াহেদ খবরে ওয়াহেদ দ্বারা কুরআনের আয়াত মনসুখ বা বাতিল হয়না৷
কিন্তু হানাফি, মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী চার মাজহাবের কোন নাসেখ-মনসুখের স্বতন্ত্র কিতাবে তাযিমী সিজদা জায়েজের এসব আয়াত মনসুখ বা বাতেল বলে গন্য হয়নি৷
রাসুল (দঃ) এঁর বর্ণিত কিছু হাদিসে সাহাবায়ে কেরাম ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় সজিদা করার অনুমতি চেয়েছিল- রাসুল (দঃ) তাঁদেরকে বিষয়টি অনুচিত বলে অনুমতি দেয়নি, বরং অনুমতি প্রার্থনায় কোন রকমের তিরস্কার বা উচ্চবাচ্য করেননি। তাই অনুমতি না দেওয়ায় অনেক জাহেরী আলেমগণ তাযিমী সিজদাকে নাজায়েজ বলেছেন।
পবিত্র কুরআনে জায়েজ ও হাদিস শরীফে নাজায়েজ দ্বন্দ্বে এটা এখতেলাফী মাসআলায় বিবেচিত। আর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, উম্মতের এখতেলাফ হলো রহমত স্বরূপ।
পবিত্র কুরআনের আয়াতের অংশ হিসেবে অনেক সুফিয়ায়ে কেরাম সজিদায়ে তাহিয়্যাকে জায়েজ জানতেন ও মানতেন। যেমন: খাজা মঈনউদ্দীন চিশতি (রহঃ), খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার খাকী (রহঃ), খাজা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ গঞ্জেশেখর (রহঃ) ও মাহবুবে ইলাহি নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহঃ)। ফাওয়ায়েদুল ফুয়াদ ওশাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহঃ) এর রচিত ফতোয়ায়ে আজিজিতেও তা বর্ণিত আছে৷ মিফতাহুল আশেকিনে কিতাবেও বর্ণিত হয়েছে, খাজা নাসির উদ্দীন মাহমুদ চেরাগ দেহলভী (রহঃ) ও হযরত বান্দা নেওয়াজ গিচু দারাজ (রহ:) কর্তৃক ইহা বৈধ বলে স্বীকৃত। লাতায়েফে আশরাফী কিতাবে এসেছে- মখদুম আশরাফ জাহাঁগীরি সিমনানী (রহঃ)ও তা জায়েজ বলে জানতেন। মাআদানুল মাআনি কিতাবে এসেছে- মখদুম শরফুদ্দিন ইয়াহিয়া মনিয়ারী(রহঃ) ও আদদুররুল মনজুম কিতাবে মখদুম জাহাঁনিয়া জাহাঁগসত সৈয়দ জালালুদ্দিন বুখারী(রহঃ),তা জায়েজ জানতেন। আনোয়ারুল উয়ুনে কিতাবে এসেছে শায়খ আবদুল হক রওদুলভী(রহঃ) শায়খুল আলম হযরত আবদুল কুদ্দুস গাঙ্গুহী(রহঃ)সহ অসংখ্য মুজতাহিদ পর্যায়ের উঁচু তবকার বুজুর্গ আলেমরা উপরোল্লিখিত কিতাবাদির নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় তাযিমী সিজদা জায়েজ বলেছেন।
তাযিমী সিজদাকে মুবাহ বা বৈধ জেনে তাদের ভক্ত মুরিদরা পীরের সামনে ও পীরের মাজারে মস্তকাবনত তাযিমী সিজদা বা সম্মান ভক্তি দিতেন।
এসব বুজুর্গদের কথা বিবেচনা করে উপমহাদেশের বিখ্যাত হাদিস বিশারদ শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রহঃ) মাদারেজুন নবুওয়তের ১ম খন্ড ও মিশকাতের শরাহ আশিআতুলুমআতে ৫ ম খন্ডে কিছু কিছু ফকিহদের বর্ণনা মতে সজিদায়ে তাহিয়্যাকে জায়েজ বলেছেন। এমনকি দেওবন্দী মান্যবর আশরাফ আলী থানভী সাহেবের “বাওয়াদিরুন নাওয়াদির” কিতাবে তাযিমী সিজদার বৈধতার পক্ষে কিছু কিছু মুজতাহিদ সুফির জায়েজ বলার কারণে এর উপর আমলকারীদের উপর তিরস্কার করা যাবেনা বলে মত দিয়েছেন।
তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের মাইজভান্ডার দরবার, মির্জাখীল দরবার, চিশতিয়া আশরাফীয়া, আবুল উলায়ীসহ বিভিন্ন হক সিসলিসিলার অনেক দরবারে পীরমুরিদের আদবের আদলে এ ধরনের রীতি চলমান আছে৷ তবে এটি প্রকাশ্যে খোলা মাঠে করা অনুচিত যেহেতু ফেতনা ফ্যাসাদের যুগ৷
জাহেরী অনেক ফুকাহায়ে কেরাম বাদশাহ আকবরের মতো বিভিন্ন অত্যাচারি রাজা বাদশাহগণ জোরপূর্বক তাযিমী সিজদা নেওয়ার ফলে এটাকে হারাম, কবিরা গুনাহ লিখেছেন। অত্যাচারি রাজা বাদশাহদের জন্য শুধু তাযিমী সিজদা নয় হাতে চুমু দেওয়াকেও নিরুৎসাহিত করেছেন ফকিহগণ।