
জে.এম জাবেদ – গণমাধ্যমকর্মী
ন্যায়বিচার শুধু একটি নীতি নয়। এটি একটি সভ্য সমাজের অস্তিত্বের ভিত্তি। কিন্তু যখন সেই ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন সমাজে নেমে আসে অদৃশ্য এক অস্থিরতা যার নাম অবিচার, পক্ষপাত এবং নীরব অন্যায়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা সংবাদপত্র খুললেই অপরাধের অসংখ্য চিত্র চোখে পড়ে। কিন্তু সেই অপরাধের বিচার ও উপস্থাপনায় এক অদ্ভুত বৈষম্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একই ধরনের ঘটনায় নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্পৃক্ততা থাকলেও, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রায়শই একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে।
নারীদের জড়িত কোনো ঘটনা যেন মুহূর্তেই জনরোষ, ট্রল এবং ভাইরাল সংস্কৃতির কেন্দ্রে চলে আসে। অন্যদিকে পুরুষদের অনেক অপরাধই থেকে যায় নীরবতার আড়ালে—কখনো উপেক্ষিত, কখনোবা স্বাভাবিকতার চাদরে ঢেকে যায়। এই বাস্তবতা সমাজের গভীরে জমে থাকা পক্ষপাতমূলক মানসিকতারই প্রতিচ্ছবি।
শারমিনের ঘটনা এই বাস্তবতারই একটি নির্মম উদাহরণ। একজন গৃহবধূ হিসেবে, সন্তান থাকা সত্ত্বেও স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতির একাকিত্বে তিনি এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সম্পর্কটি একদিন-দুই দিনের নয় প্রায় তিন বছর ধরে চলতে থাকে নীরবে, গোপনে, এক জটিল আবেগের ভেতর।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে যখন সেই যুবক অন্যত্র বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ভেঙে পড়ে সম্পর্কের ভারসাম্য। শারমিন যাকে আবেগ ও আত্মিক বন্ধন হিসেবে দেখেছিলেন, সমাজ সেটিকে দেখল শুধুই অপরাধের চোখে। বিচার হলো একতরফা দোষী বানানো হলো কেবল একজনকেই।
তিনি হয়ে উঠলেন ‘অপকর্মে লিপ্ত নারী’। অথচ এই সম্পর্কের অন্য প্রান্তে থাকা ব্যক্তি থেকে গেল প্রায় অদৃশ্য, সমালোচনার বাইরে, প্রশ্নের আড়ালে।
পরিণতিতে শারমিন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, এমনকি নিজ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়।ন্যায়বিচার কি সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হলো, নাকি সমাজ তার সহজ লক্ষ্যকেই বেছে নিল?
এটাই আমাদের সমাজের নির্মম বাস্তবতা বিচার অনেক সময় অপরাধের ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যক্তি কে, তার অবস্থান কী, তার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। প্রভাব, পরিচিতি এবং লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি এখানে নীরব কিন্তু শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
কিন্তু ন্যায়বিচারের মূল শর্ত একটাই অপরাধ দেখবে অপরাধ হিসেবে, পরিচয় নয়। নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র কিংবা প্রভাবশালী-অপ্রভাবশালী এই বিভাজনের বাইরে গিয়ে সমান বিচার নিশ্চিত না হলে সমাজে ন্যায়ের ভিত্তি কখনোই স্থায়ী হবে না।ন্যায়বিচারহীন সমাজে শান্তি কেবল একটি ভঙ্গুর ধারণা। সেখানে ধীরে ধীরে অন্যায়ই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, আর ন্যায়বোধ হয়ে পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ।
তাই এখনই সময় এই অদৃশ্য বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে একটি সত্যিকারের ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার। যেখানে বিচার হবে নিরপেক্ষ, অপরাধ হবে একমাত্র মানদণ্ড, আর মানুষ নয়-ন্যায়ই হবে সর্বোচ্চ সত্য।