শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
আদর্শের বাতিঘর: রাজপথ ও কূটনীতির সফল কান্ডারি আতাউর রহমান খান কায়সার রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খান কায়সারের ১৬ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ আনোয়ারায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের মতবিনিময় জেন জেড হাওড়ার প্রথম সনাতনী পূজা বালি মিলেনিয়াম ক্লাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিলেটে স্বজন স্মরণ কর্মসূচি ২০২৬ ও শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ আজ ‘সতীর দেহত্যাগ’ ভাবনায় জামির স্বপ্ন মেকওভারের বিশেষ ফটোশুট বোয়ালখালীতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে আইন-শৃঙ্খলা সভা দীর্ঘদিন পর বটতলী এস এম আউলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শাওলিন কুংফু ও উশু একাডেমির পুনঃউদ্বোধন আনোয়ারায় বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি, চার বঢ়বসায়ীকে লাখ টাকা জরিমানা সাংবাদিক কামাল পারভেজকে হুমকি, চট্টগ্রাম টেলিভিশন রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক (সিটিআরএন) এর প্রতিবাদ

আদর্শের বাতিঘর: রাজপথ ও কূটনীতির সফল কান্ডারি আতাউর রহমান খান কায়সার

সংবাদ দাতার নাম
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩৩ বার পড়া হয়েছে

 

আবু তৈয়ব মোহাম্মদ রাসেল

​আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, নির্লোভ মানসিকতা আর অনন্য প্রজ্ঞার প্রতীক ছিলেন আতাউর রহমান খান কায়সার। একাধারে তিনি ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবক, কূটনীতিবিদ। প্রচারবিমুখ এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জীবনের প্রতিটি পদে সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে গেছেন। দেশ ও দলের যেকোনো দুঃসময়ে তাঁর মতো দূরদর্শী ও আপসহীন নেতৃত্বের ভীষণ প্রয়োজন ছিল।

​ঐতিহ্যবাহী পরিবার ও প্রারম্ভিক জীবন-
১৯৪০ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরাস্থ ঐতিহাসিক বাংশালবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আতাউর রহমান খান কায়সার। পিতা আলহাজ্ব এয়ার আলী খান ছিলেন বঙ্গীয় আইন পরিষদ ও পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং মাতা গুলশান আরা বেগম ছিলেন সুগৃহিণী। তাঁর নানা ছিলেন তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গলের এমএলএ ও চট্টগ্রাম পৌরসভার (বর্তমান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন) প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান খান বাহাদুর আব্দুস সাত্তার। তাঁর পিতামহ ছিলেন প্রখ্যাত জমিদার এরশাদ আলী সরকার। পরিবারের মূল আদি নিবাস চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের তৈলারদ্বীপ গ্রামে। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তাঁর পরিবারের অবদান ছিল অনস্বীকার্য; ১৯১৪ সালে তাঁর পিতামহ আনোয়ারার প্রথম উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

​পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের মেলবন্ধন-
১৯৬৭ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত ছাত্রনেত্রী ও ‘অগ্নি কন্যা’ মতিয়া চৌধুরীর রাজনৈতিক সহযোদ্ধা নিলুফারের সাথে। এই দম্পতি ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। নিলুফা কায়সার পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী ও জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

​মুক্তিযুদ্ধ ও প্রারম্ভিক রাজনৈতিক যাত্রা-
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আতাউর রহমান খান কায়সার অসাধারণ সাহসিকতার সাথে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ২৬ ও ২৭শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ ও সংশোধনের ক্ষেত্রে এ কে খানের পরামর্শে তিনি গুরুদায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র স্থাপন, এম এ হান্নান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ এবং ১ নম্বর সেক্টরের রাজনৈতিক সমন্বয়কারী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এ হান্নান ও এম এ মান্নানের মতো প্রাতঃস্মরণীয় নেতাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি রাজপথ কাঁপিয়েছেন।
​স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রতিবাদে রাজপথে নামেন। দীর্ঘ সামরিক শাসন ও অস্থির সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে দুই বার গ্রেফতার হন এবং ১১ মাস কারাবরণ করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক নির্বাচিত হন।

​১/১১-এর দুঃসময় ও আপসহীন সংগ্রাম-
২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক সংকটের সময় দলের গভীর দুঃসময়ে আতাউর রহমান খান কায়সার যে বীরত্ব ও ত্যাগের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। সে সময় তাঁর প্রিয় সহধর্মিনী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে শয্যাশায়ী ছিলেন। জীবনের এই চরম পারিবারিক কঠিন মুহূর্তেও তিনি দেশ ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দেন। মরণব্যাধিতে আক্রান্ত স্ত্রীকে হাসপাতালের বেডে রেখে তিনি দ্রুত ঢাকায় ছুটে যান। তৎকালীন সেনা সমর্থিত সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার গৃহবন্দিত্বের (হাউস অ্যারেস্ট) পর প্রথম রাজপথে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন আতাউর রহমান খান কায়সার।

​কূটনীতি ও নীতি নির্ধারণে অবদান-
জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৯৯৬ সালের সরকারে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় (১৯৯৭) এবং পরবর্তীতে রাশিয়ায় (১৯৯৯) বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান সময়ে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের যে গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তার মজবুত ভিত্তি রচিত হয়েছিল রাষ্ট্রদূত কায়সারের হাত ধরেই।
​এছাড়া, তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক কমিটি এবং পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়া মূল্যায়ন প্যানেলের অর্থনীতিবিদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৯৭ সালে গণচীনের আমন্ত্রণে হংকংয়ের পুনরেকত্রীকরণ উৎসবে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশ নেন।

​পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি ও দূরদর্শী ভূমিকা-
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ১৯৮৬ সালে শেখ হাসিনার নির্দেশে যে প্রাথমিক রূপরেখা ও কমিটি গঠন করা হয়, তার নেপথ্যে মূল রূপকার ছিলেন আতাউর রহমান খান কায়সার। তাঁর দীর্ঘ প্রস্তুতি ও দূরদর্শী ভূমিকার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন জাতীয় কমিটি জনসংহতি সমিতির সাথে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সম্পাদনে সক্ষম হয়।

​শিক্ষা বিস্তার ও জনকল্যাণ-
রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। ১৯৭২ সালে আনোয়ারা কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি প্রধান ভূমিকা রাখেন এবং নিজের বন্ধু লেখক মোঃ হোসেন খানকে এর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে স্বল্পসময়ে সেটিকে ডিগ্রি কলেজে উন্নীত করেন। এছাড়া তৈলারদ্বীপ এরশাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়, চকরিয়ার রাজাখালী এয়ার আলী খান উচ্চ বিদ্যালয়, চন্দনপুরা গুল-এজার বেগম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদের শীর্ষে থেকে শিক্ষানুরাগের পরিচয় দেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

​রাজনীতির এই অকুতোভয় সৈনিক ও ক্ষণজন্মা জননেতা ২০১০ সালের ৯ই অক্টোবর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

​আগামীকাল এই মহান জননেতার ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। আজকের এই দিনে কালজয়ী এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীরতম শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালোবাসা। ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ তাঁর নীতি, সততা আর কর্মের মধ্য দিয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে। চট্টগ্রাম তথা সমগ্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আতাউর রহমান খান কায়সারের ত্যাগ, আদর্শ ও নিবেদন নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য চিরকাল এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে দিকনির্দেশনা দেবে।

​আবু তৈয়ব মোহাম্মদ রাসেল
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব,
আতাউর রহমান খান কায়সার স্মৃতি সংসদ,
সংযুক্ত আরব আমিরাত কেন্দ্রীয় কমিটি।

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©2020 All rights reserved
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102