
মো আবদুল করিম সোহাগ -ঢাকা
বর্তমান প্রজন্মের আলোচিত অভিনেত্রী ক্যামেলিয়া রাঙা ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলছেন বহুমাত্রিক এক পরিচয়ে। অভিনয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, ব্যবসায়িক উদ্যোগ, ব্যক্তিগত জীবনবোধ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সব মিলিয়ে তিনি এখন কেবল একজন অভিনেত্রী নন, বরং নিজের মতো করে পথ তৈরি করে চলা এক আত্মবিশ্বাসী নারী।
সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় ক্যামেলিয়া রাঙা তার অভিনয়জীবনের শুরু থেকে বর্তমান অবস্থান পর্যন্ত নানা অজানা গল্প তুলে ধরেছেন। সেই কথোপকথনে উঠে এসেছে তার শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প, শোবিজে আসার পেছনের প্রেরণা, বড় পর্দায় কাজের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং আগামী দিনের লক্ষ্য।
ক্যামেলিয়ার ভাষায়, অভিনয়ের প্রতি তার ভালোবাসা নতুন করে তৈরি হয়নি, বরং এটি অনেকটা তার বেড়ে ওঠার সঙ্গেই মিশে আছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি বড় হয়েছেন একটি সাংস্কৃতিক আবহের মধ্যে। তার দাদী, চাচাসহ পরিবারের অনেকেই একসময় মঞ্চ নাটক, গান ও কবিতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই পারিবারিক শিল্পচর্চাই অজান্তেই তাকে টেনে এনেছে অভিনয়ের জগতে।
শৈশবের কথা বলতে গিয়ে ক্যামেলিয়া জানান, ছোটবেলায় তিনি ছিলেন খুবই চঞ্চল স্বভাবের। নাচ, দৌড়ঝাঁপ, হৈচৈ, সবকিছুতেই ছিল তার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তবে তখনও তিনি ভাবেননি, একসময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোই হয়ে উঠবে তার পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
তার অভিনয়জীবনের বড় মোড় আসে পরিচালক মিজানুর রহমান লাবু-র হাত ধরে। একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তাকে দুটি গল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। একটি ছিল গ্ল্যামারনির্ভর, অন্যটি বাস্তবধর্মী। ক্যামেলিয়া বেছে নেন বাস্তবতার গল্পটি। তার সেই সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। সেখান থেকেই শুরু হয় তার চলচ্চিত্র যাত্রা, প্রথম সিনেমা ‘নূরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার’ দিয়ে।
অনেক শিল্পী যেখানে ছোট পর্দা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বড় পর্দায় নিজেদের জায়গা করে নেন, ক্যামেলিয়ার ক্ষেত্রে সেই যাত্রাপথ ছিল একটু আলাদা। ২০১৬ সালে এনটিভিতে তার প্রথম নাটক ‘তপস্বিনী’ প্রচারের পর সেটি দেখেই তাকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই নাটকে তিনি কাজ করেন সজল, তারেক আনাম ও ড. ইনামুল হক-এর মতো গুণী শিল্পীদের সঙ্গে। ক্যারিয়ারের শুরুতেই এমন শিল্পীদের পাশে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে অভিনয়ের জায়গায় আরও দৃঢ় করে তোলে।
পরে চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেন ফজলুর রহমান বাবু-র মতো শক্তিমান অভিনেতার বিপরীতে। তার অভিনয়ের পছন্দেও রয়েছে আলাদা এক পরিমিতি। গ্ল্যামারের মোড়কে আবদ্ধ চরিত্রের চেয়ে তিনি বরাবরই বেশি আগ্রহী গল্পনির্ভর, বাস্তবধর্মী ও চরিত্রকেন্দ্রিক কাজের প্রতি। তার বিশ্বাস, একজন শিল্পীর সত্যিকারের পরিচয় তৈরি হয় চরিত্রের গভীরতা ও অভিনয়ের সততায়।
২০১৬ সালে শোবিজে যাত্রা শুরু করা ক্যামেলিয়া রাঙা এখন পর্যন্ত চারটি সিনেমায় কাজ করেছেন। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও, তার প্রতিটি কাজেই রয়েছে নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা। ধীরে ধীরে তিনি নিজের জন্য তৈরি করেছেন আলাদা একটি অবস্থান, যেখানে তিনি শুধু উপস্থিতির জন্য নন, বরং কাজের নির্বাচনের কারণেও আলোচনায় থাকেন।
দেশীয় অঙ্গনের বাইরে আন্তর্জাতিক পরিসরেও পৌঁছে গেছে তার কাজ। তার অভিনীত সিনেমা ভারতের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে এবং সেখান থেকে তিনি পেয়েছেন সম্মাননা। শুধু অভিনয় নয়, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতেও যুক্ত হয়েছেন তিনি। লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক একটি বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ম্যাগাজিনে মডেল হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ক্যামেলিয়া। ভিসা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে খুব শিগগিরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্যামেলিয়ার ভাবনা যেমন স্পষ্ট, তেমনি দৃঢ়ও। তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর জীবনে অভিনয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। কাজের মাধ্যমেই একজন শিল্পী বেঁচে থাকেন দর্শকের হৃদয়ে।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন,
“অভিনয় আমার আত্মার সাথে না, রক্তের সাথে মিশে গেছে, আর আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অভিনয়টা করে যেতে চাই।”
এই একটি বাক্যই যেন তার পুরো শিল্পীসত্তার সারাংশ। অভিনয় তার কাছে কেবল একটি পেশা নয়, বরং অস্তিত্বের অংশ।
বাণিজ্যিক সিনেমাতেও নিজেকে আরও শক্ত অবস্থানে দেখতে চান ক্যামেলিয়া। সেই স্বপ্নের তালিকায় রয়েছে ঢালিউড সুপারস্টার শাকিব খান-এর সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করার ইচ্ছাও। তিনি মনে করেন, বড় পরিসরে কাজ করতে হলে নিজের প্রস্তুতি, ধৈর্য এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মানসিকতা খুবই জরুরি।
অভিনয়ের পাশাপাশি শিক্ষাজীবনেও তিনি এগিয়ে যেতে চান সমান গুরুত্ব দিয়ে। সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করলেও করোনাকালীন পরিস্থিতির কারণে তার মাস্টার্স কিছুটা থেমে যায়। ভবিষ্যতে দেশের বাইরে গিয়ে সেই পড়াশোনা শেষ করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
শুধু অভিনয়জগতে নয়, বাস্তব জীবনেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট ক্যামেলিয়া। ২০২১ সাল থেকে তিনি ট্রেডিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন সোলার এনার্জি প্রজেক্ট নিয়েও। তার মতে, মিডিয়ার গ্ল্যামার ধরে রাখতে যেমন ব্যয় আছে, তেমনি একজন শিল্পীর নিজের জন্য আর্থিক নিরাপত্তাও জরুরি। তাই অভিনয়ের পাশাপাশি একটি স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করাকে তিনি প্রয়োজনীয় বলেই মনে করেন।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী। বিয়ে নিয়ে এখনই কোনো তাড়াহুড়ো নেই তার। তিনি মনে করেন, জীবনসঙ্গী এমন একজন হওয়া উচিত, যিনি বন্ধুর মতো খোলা মনের, যত্নশীল, দায়িত্বশীল এবং পরিবারকে গুরুত্ব দেন। বিদেশি নয়, বরং একজন দেশি, আন্তরিক ও মনখোলা মানুষকেই তিনি জীবনসঙ্গী হিসেবে প্রাধান্য দেবেন বলে জানান।
সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফরে গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে ক্যামেলিয়ার। সেখানকার অভিজ্ঞতা তাকে আবেগাপ্লুত করেছে। পরিবার-পরিজন ছেড়ে বিদেশের মাটিতে যারা নিরন্তর সংগ্রাম করছেন, তাদের প্রতি তিনি জানিয়েছেন গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
অভিনয়, আন্তর্জাতিক স্বপ্ন, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত দৃঢ়তায় ক্যামেলিয়া রাঙা এখন নিজেকে গড়ে তুলছেন নতুন এক উচ্চতার জন্য। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া তার শোবিজ যাত্রা আজ ধীরে ধীরে পৌঁছে যাচ্ছে আরও বড় পরিসরে, আর সেই পথচলায় তিনি যেন আরও বেশি করে বিশ্বাস করতে শিখেছেন নিজের স্বপ্ন, নিজের পরিশ্রম এবং নিজের শিল্পীসত্তাকে।