
প্রথম ডেক্স
নিজ গ্রামে রয়েছে বসতভিটা, পুকুর ও পাকা বাড়ি। অথচ নিজেকে 'উদ্বাস্তু' পরিচয়ে চট্টগ্রাম নগরের নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত একটি বাসভবন দীর্ঘ ৬-৭ বছর ধরে দখলে রাখার অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদ ইদ্রিছ নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির স্বাক্ষর জাল করে উদ্বাস্তু সনদ তৈরির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
গণপূর্ত বিভাগের দাবি, বাসভবনটি খালি করে দেওয়ার বিষয়ে আদালতের রায়ও হয়েছে। তাঁকে একাধিকবার বাড়ি ছাড়ার জন্য বলা হয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎ ও ওয়াসার সংযোগ বিচ্ছিন্নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো বাসাটি দখলমুক্ত হয়নি। ফলে সরকারি জায়গাটিতে নতুন ভবন নির্মাণের কাজও আটকে আছে।
সরকারি চাকরি করা স্ত্রী অবসরে গেলে ইদ্রিছ নিজেকে উদ্বাস্তু ও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে বাসাটি ধরে রাখার চেষ্টা করেন। এ নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলাও করেন তিনি।
গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান জিতু বলেন, 'এটা সরকারের পরিত্যক্ত সংরক্ষিত বাড়ি। মোহাম্মদ ইদ্রিছের স্ত্রী যখন শিক্ষিকা ছিলেন, তখন তাঁর স্ত্রী আবেদনের মাধ্যমে সেখানে থাকার সুযোগ পান। এরপর স্ত্রী যখন অবসরে চলে যান, তখন তিনি উদ্বাস্ত মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে একপ্রকার জোড় করে এই বাসাটিতে বসবাস করতে থাকেন।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এর বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে রায়ের মাধ্যমে বাড়িটি খালি করে দেওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ৬-৭ বছর হলেও এখনো তিনি দখল করে আছেন।' তিনি আরো বলেন, 'তাঁকে বারবার ছাড়তে বলা হলেও তিনি আমাদের কাছে বিকল্প একটি বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার দাবি করছেন। আইনগতভাবে সেটা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। পরে বিদ্যুৎ ও ওয়াসাকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য জানিয়ে দিই। কিন্তু তিনি এখনো পানি ও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে হাইকোর্ট থেকে রায় আমাদের পক্ষে এসেছে। ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়ের নির্দেশনা পাওয়া মাত্রই আমরা উচ্ছেদের দিকে যাব।'
ইন্দ্রিছের গ্রামের বাড়ি আনোয়ারা উপজেলার মাহাতা গ্রামে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, সেখানে তাঁর নিজস্ব জায়গা-সম্পত্তি, পুকুর, বসতভিটা ও বাড়িঘর রয়েছে। বর্তমানে সেখানে পাকা ভবনও রয়েছে। অন্যদিকে ইদ্রিয়ের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মুক্তিযোদ্ধাদের বক্তব্যে এ দাবির সঙ্গে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। আনোয়ারা উপজেলার ৯ নম্বর পরৈকোড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আখতার জামাল চৌধুরী বাবু বলেন, 'আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে হয়তো তিনি উদ্বাস্ত পরিচয় দিয়েছেন। আমি দীর্ঘ ২৮ বছর চেয়ারম্যান ছিলাম। এ সময়ে আমার কাছ থেকে তিনি কোনো সার্টিফিকেট নেননি। তাছাড়া তাঁর ঘর-বাড়ি সবই আছে।'
বর্তমান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মোরশেদ হোসেন চৌধুরী বলেন, 'উনার জায়গা-সম্পত্তি, পুকুর, ভিটামাটি আছে। উনার কিছু নাই বললে সেটা তো হবে না। আমরা ছোটকাল থেকে দেখে আসছি।'
ইদ্রিছ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেন এবং সরকারি ভাতা গ্রহণ করছেন। তবে আনোয়ারা ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাছির উদ্দিন আহমদ শাহ বলেন, 'আমরা একসাথে যুদ্ধ করেছিলাম। যুদ্ধের সময় তার কোনো বাড়িতে হামলা হয়নি। সে জাল-জালিয়াতি করে কাগজপত্র বানিয়ে হাইকোর্টে রিট করে, যাতে বাড়িটি সে দখল করে আজীবন ভোগ করতে পারে। প্রশাসনের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।'
গণপূর্ত বিভাগের দাবি, ইদ্রিছের দখলে থাকা বাড়িটির কারণে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান জিতু বলেন, 'শুধু উনার কারণে আমরা ওখানে নতুন ভবনের কাজ করতে পারছি না। যদি উনি চলে যেতেন, তাহলে আমরা দ্রুত ভবনের কাজ ধরতে পারতাম।' অর্থাৎ, একটি সরকারি আবাসিক ভবন নিয়ে ব্যক্তিগত দখল ও আইনি জটিলতার কারণে সরকারি সম্পদ ব্যবহারের পাশাপাশি উন্নয়নকাজও আটকে রয়েছে বলে দাবি গণপূর্ত বিভাগের।
ইদ্রিছের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজির অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজা মিয়া বলেন, 'আওয়ামী লীগের সময়কালে ইদ্রিছ সমাজকল্যাণ পরিষদ গঠন করে ১৫ আগস্ট ও ১৬ ডিসেম্বর ম্যাগাজিন তৈরির নাম দিয়ে ব্যাপক চাঁদাবাজি করতো। দুইটি স্মরণিকা প্রকাশের মাধ্যমে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা কামিয়ে নিতো। এখন আবার সেভাবে শুরু করেছে।'
আনোয়ারা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক এম. নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, 'আমাদের সংগঠনের সভাপতি দাবি করে তিনি বিভিন্ন জনের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করেছেন। অথচ তিন বছর আগে আমরা নির্বাচিত হয়েছি। সরকারি বাড়িটিও তিনি দখল করে আছেন।'
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে মোহাম্মদ ইদ্রিছের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'আমার বিরুদ্ধে আপনাকে কেউ নিউজ দিয়েছে বুঝতে পেরেছি। আমি আগামীকাল আপনার সঙ্গে দেখা করবো।'