আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাতরী ইউনিয়নের বেলচুড়া আদর্শ গ্রাম সড়কটি যেন দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকহীন। প্রায় ৪০ বছরেও সড়কটির স্থায়ী উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বর্ষা এলেই সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয় কাদা ও বড় বড় গর্ত। এতে যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি হেঁটে চলাচলেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধি ও প্রার্থীরা সড়কটি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন আর দেখা যায় না। ফলে বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগের মধ্যেই বসবাস করছেন বেলচুড়া আদর্শ গ্রামের মানুষ।
সম্প্রতি দীর্ঘ অপেক্ষার পর সড়কটির প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফুট অংশের মধ্যে প্রায় ৩৫০ ফুট ইটের সলিং করার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, বরাদ্দের ওই কাজের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট ইট বসানো হয়েছে। এরপর কাজ বন্ধ থাকায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে তাদের মধ্যে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন থেকে বেলচুড়া আদর্শ গ্রামের দিকে যাওয়া সড়কটির বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত। বৃষ্টির পানিতে গর্তগুলো কাদায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সড়কের শুরু ও শেষ অংশের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। এসব অংশ দিয়ে হেঁটে চলাচল করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত মে মাসে এলজিইডি থেকে সড়কের একটি অংশে ইটের সলিংয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজ শুরুর পর প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট ইট বসানোর পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে আর কাজ শুরু না হওয়ায় বরাদ্দের কাজের অগ্রগতি ও মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৪ নম্বর বটতলী ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য রওশন আক্তার মুন্নী সড়কটির ইটের সলিংয়ের কাজের ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে সরকারি উন্নয়নকাজের ঠিকাদারির সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ তদারকির বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, রওশন আক্তার মুন্নীর স্বামী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে চাকরি করেন। তার মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় তার নয়টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে বলে তিনি নিজেই দাবি করেছেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
বেলচুড়া আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান বলেন, আমরা চরম অবহেলিত এলাকায় বসবাস করছি। দীর্ঘ দুই দশক ধরে এ অবস্থার মধ্যে আছি। কোনো বয়স্ক ব্যক্তি অসুস্থ হলে কিংবা অন্তঃসত্ত্বা নারীকে হাসপাতালে নিতে হলে কাঁধে করে পাকা সড়ক পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়।
সড়কের কিছু অংশে ইট বসানো হলেও পুরো সড়ক সংস্কার না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না এলাকাবাসী। তাদের দাবি, সাময়িকভাবে ইট বিছিয়ে নয়, দ্রুত সড়কটি টেকসইভাবে সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা হোক।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য জাগীর আহমদ বলেন, ৪০ বছর ধরে সড়কটিতে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। একজন জনপ্রতিনিধি যদি ৪০ বছর ধরে একটু একটু করে কাজ করতেন, তাহলে সড়কের এমন অবস্থা হওয়ার কথা নয়। সড়কটি পাকা করার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। গত মে মাসে ২০০ ফুট ইট বসিয়ে সংস্কারের কাজ করা হয়েছে। আরও ১০০ ফুটের কাজ দুই-এক দিনের মধ্যে শেষ হবে। আপাতত কিছু ভাঙা ইট দিয়ে সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
চাতরী ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবুল মনসুর বলেন, রাস্তাটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে রয়েছে। সড়কটি পাকা করার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন। এটি পাস হলে দ্রুত কাজ শুরু করা যাবে।
এদিকে সড়কের ইটের সলিংয়ের কাজ পাওয়া ঠিকাদার ও বটতলী ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য রওশন আক্তার মুন্নী বলেন, উপজেলা থেকে সাড়ে ৩৫০ ফুট সড়ক ইটের সলিং করার বরাদ্দের কাজটি আমি পেয়েছি। বৃষ্টির কারণে বর্তমানে কাজ বন্ধ রয়েছে। সাড়ে ৩৫০ ফুটের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০ ফুট কাজ হয়েছে।
কাজে নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাজে এখন পর্যন্ত কোনো অনিয়ম হয়েছে- এমন কথা কেউ বলতে পারবে না। কাজ শেষ করে এলজিইডিকে বুঝিয়ে দেব। কাজের মান খারাপ হলে কর্তৃপক্ষ বিল কম দেবে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকাতেও আমার নয়টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। সেসব কাজ আমিও সরেজমিনে দেখাশোনা করি।
তবে কাজের বরাদ্দ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও কাজের বিস্তারিত জানতে চাইলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রওশন আক্তার মুন্নী বলেন, সড়কের কাজ বন্ধ। কাজের ভালো-মন্দ দেখবে উপজেলা প্রকৌশলী। এখানে সাংবাদিকদের কাজ কী? আমার কাজ নিয়ে সাংবাদিকদের এত মাথাব্যথা কেন? আমার কাজ আমি এলজিইডিকে বুঝিয়ে দেব। কাজের মান খারাপ হলে কর্তৃপক্ষ টাকা কম দেবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, একদিকে বৃষ্টির কারণে আনোয়ারার সড়কের কাজ বন্ধ থাকার কথা বলা হলেও একই ঠিকাদারের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় নয়টি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকার দাবি রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ, বাস্তবায়ন, কাজের অগ্রগতি ও মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা প্রকৌশলী জাহেদুল আলম চৌধুরী বলেন, সড়কের কাজ আগামী সপ্তাহে শুরু করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে সরকারি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।