কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
ঝড়ো হাওয়া উঠলেই কেঁপে ওঠে মাথার ওপরের বিশাল ধাতব কাঠামোটি। আর সেই কাঁপুনির সঙ্গে কেঁপে ওঠে ভেতরে থাকা ১২০ জন এতিম শিশুর বুকও। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শাহ আমানত সেতুর টোল প্লাজা এলাকায় একটি তিনতলা ভবনের গায়ে ঝুলে থাকা বিশাল বিলবোর্ড এখন স্থানীয়দের কাছে নিছক বিজ্ঞাপন নয়—একটি জীবন্ত আতঙ্কের নাম।
মাত্র সাত ফুট দূরত্ব। এই সামান্য ব্যবধানেই দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী চরপাথরঘাটা হামিদিয়া বাগদাদিয়া এতিমখানা ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা, যেখানে দিনরাত অবস্থান করে ১২০ জন কোমলমতি শিক্ষার্থী ও ১০ জন শিক্ষক-কর্মচারী। বিলবোর্ডের ঠিক গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আরেকটি নীরব বিপদ—১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার। আর সামনেই হাজার হাজার গাড়ির চাকার শব্দে মুখর ব্যস্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক। এক জায়গায় এতগুলো ঝুঁকির সমাবেশ—স্থানীয়দের ভাষায়, এ যেন "দুর্ঘটনার জন্য অপেক্ষা করা এক প্রকল্প।"
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা হাফেজ আতাউল্লাহর কণ্ঠে সেই আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, "উত্তরি হাওয়া শুরু হলে কেঁপে ওঠে ভবনটি। তখন আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে শিশুরা।" নিছক কথার কথা নয়—এই আতঙ্ক থেকেই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ একের পর এক দরজায় কড়া নেড়েছে। মৌখিক অনুরোধে কাজ না হওয়ায় ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই পর্যন্ত পাঠানো হয়েছে তিন-তিনটি লিখিত নোটিশ। কিন্তু ফলাফল শূন্য।
ভবন মালিক আবু সামার ভাষ্যে উঠে এসেছে দায় এড়ানোর সুর—বিলবোর্ডটি তাঁর নয়, ভাড়া দেওয়া হয়েছে এক বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের কাছে। মাদ্রাসার উদ্বেগ তিনি "জানিয়েছেন" বলে দাবি করলেও, বাস্তবে কাঠামোটি এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সেই আগের জায়গাতেই।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রবিউল ইসলামের প্রশ্নটি স্থানীয় সবার মনের কথা—"একদিকে এতিমখানা, অন্যদিকে ১১ হাজার ভোল্টের ট্রান্সফরমার, সামনে মহাসড়ক। এর মাঝখানে এত বড় বিলবোর্ড ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশাসনের উচিত দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।" আরেক বাসিন্দার কণ্ঠেও একই উদ্বেগ—ঝড়ো বাতাসে দুলতে থাকা বিলবোর্ডটি বহু বছর ধরে সেখানে থাকলেও, এখন এর কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়েই বেড়েছে শঙ্কা।
মাদ্রাসার সর্বশেষ নোটিশের ভাষা ছিল কঠোর—বিলবোর্ড অপসারণে গড়িমসি "জননিরাপত্তার প্রতি চরম অবহেলার শামিল" বলে উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অপসারণ না হলে উপজেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মোবাইল কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে নোটিশে। কিন্তু এত কিছুর পরও নীরব রয়ে গেছে প্রশাসনিক যন্ত্র—কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই, নেই কোনো জবাব।
এতিমখানা প্রাঙ্গণে যখন শিশুদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে হাফেজিয়া পাঠের সুর, তখন মাথার ওপর দুলতে থাকে একটি প্রশ্নবিদ্ধ কাঠামো। স্থানীয়দের একটি কথাই যেন এই পুরো পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ করে দেয়—"দুর্ঘটনা ঘটার পর দায়ী খোঁজার চেয়ে দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি দূর করাই প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।" প্রশ্ন একটাই—সেই দায়িত্ব পালনের অপেক্ষায় আর কত দিন থাকতে হবে কর্ণফুলীর এই এতিম শিশুদের?