দুই দশকের পথচলা ও সংগ্রামের গল্প মারিয়া কিসপট্টার

প্রকাশিত: ১০:০২ অপরাহ্ণ, মার্চ ৫, ২০২৬

মো আবদুল করিম সোহাগ -ঢাকা

বাংলাদেশের ফ্যাশন অঙ্গনের পরিচিত মুখ র‍্যাম্প মডেল Maria Kispotta। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের ফ্যাশন রানওয়ে ও মডেলিং জগতে কাজ করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি যেমন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি নতুন প্রজন্মের জন্যও তৈরি করেছেন একটি মডেল গ্রুমিং প্ল্যাটফর্ম। ক্যারিয়ারের শুরু, সংগ্রাম, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন তিনি।
মারিয়া কিসপট্টার মডেলিং ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল বেশ কাকতালীয়। তার ভাষায়, একরকম বাসা থেকে নিয়ে গিয়েই তাকে মডেলিংয়ের জগতে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। প্রথম কাজটি ছিল জনপ্রিয় ব্যান্ডতারকা জেমসের একটি গানের মিউজিক ভিডিওতে মডেল হিসেবে। এরপর একে একে তিনি কাজ করেন আইয়ুব বাচ্চুর গানের ভিডিওতেও। সেই ধারাবাহিকতায় পার্থ বড়ুয়া, মাইলস এবং প্রমিথিউসের মতো জনপ্রিয় ব্যান্ডের বিভিন্ন মিউজিক ভিডিওতেও দেখা যায় তাকে।
মিউজিক ভিডিওতে কাজ করার পর একটি নতুন সুযোগ আসে। জাদুম্যুজিক প্রোডাকশনের মাধ্যমে তাকে চ্যানেল আইয়ের একটি মিউজিক শোতে উপস্থাপক হিসেবে নেওয়া হয়। সেখান থেকেই তার পথ খুলে যায় র‍্যাম্প মডেলিংয়ের জগতে। বাংলাদেশের ফ্যাশন রানওয়েতে তার প্রথম পদচারণা হয় মডেল নোবেলের সঙ্গে জুটি হয়ে। সেই মঞ্চে ওঠাই ছিল তার ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি; ধারাবাহিকভাবে কাজ করে গেছেন এই অঙ্গনে।
শুরুর সময়ের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মারিয়া বলেন, তখনকার সময়টা ছিল ভীষণ আন্তরিক ও সহযোগিতাপূর্ণ। মডেলদের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য ছিল, সবাই সবাইকে সহযোগিতা করতেন। সিনিয়রদের প্রতি সম্মান দেখানো, সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মিতা—এসব বিষয় ছিল খুব স্বাভাবিক। এখনকার সময়ের তুলনায় তখন গ্রুপিং বা ঈর্ষার প্রবণতা অনেক কম ছিল বলেও মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, সেই সময় পুরো ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি যেন একটাই পরিবার ছিল।
দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই অঙ্গনে কাজ করতে গিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাকে। তবে নিজের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কাউকে ব্যবহার না করে এবং নিজেও ব্যবহৃত না হয়ে নিজের জায়গা তৈরি করা। তিনি মনে করেন, এই জায়গায় পৌঁছাতে তাকে অনেক সময়, শ্রম এবং কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অনেক প্রতিকূলতা ও অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা পার করেও শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান তৈরি করতে পেরে তিনি সন্তুষ্ট।
ফ্যাশন রানওয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে গত এক দশকে বেশ কিছু পরিবর্তনও লক্ষ্য করেছেন এই অভিজ্ঞ মডেল। তার মতে, এখনকার মডেলরা অনেক বেশি আগ্রাসী এবং প্রতিযোগিতামুখী। আগে যেখানে নম্রতা, সৌজন্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বেশি দেখা যেত, এখন সেখানে সেই পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। তবে পরিবর্তনের ভালো দিকও রয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের মডেলরা নিজেদের পেশাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়, সময় দেয় এবং শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির দিকেও বেশি মনোযোগী।
একজন র‍্যাম্প মডেল হিসেবে নিজেকে ধরে রাখতে যে পরিমাণ প্রস্তুতি ও পরিশ্রম প্রয়োজন, তা অনেকেই বাইরে থেকে বুঝতে পারেন না বলে মনে করেন মারিয়া। মানুষের চোখে মডেলদের জীবন যতটা গ্ল্যামারাস মনে হয়, বাস্তবে তার পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম। ফ্যাশন শোর আগে এক থেকে তিন দিন পর্যন্ত রিহার্সাল চলে, যেখানে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা টানা হাঁটতে হয়। তাও আবার পাঁচ বা ছয় ইঞ্চি হিল পরে, নির্দিষ্ট গতি ও শরীরের ভঙ্গিমা বজায় রেখে। দিনের পর দিন এমন অনুশীলনের ফলে শারীরিক ক্লান্তি চরমে পৌঁছায়। অনেক সময় পায়ে ক্র্যাম্প হয়ে যায়, তবু সহকর্মীরা একে অপরকে সাহায্য করে শো চালিয়ে যান। তার মতে, যারা এই কাজের ভেতরে নেই তারা এই পরিশ্রমের মাত্রা সহজে বুঝতে পারেন না।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে নতুনদের জন্য কাজ করতেও আগ্রহী তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত মডেল গ্রুমিং একাডেমি ‘জেনেসিস বাই মারিয়া কিসপট্টা’ মূলত নতুন মডেলদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে তিনি নিজেই প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। নতুন যারা মডেলিংয়ে আসতে চান, তাদের শুধু র‍্যাম্পে হাঁটা নয়, বরং মিডিয়ায় নিজেদের কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে—সেসব বিষয়ও শেখানো হয়। তার পরামর্শ, দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভেবে-চিন্তে লক্ষ্য ঠিক করা এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়াই সফলতার পথে গুরুত্বপূর্ণ।
কাজের ব্যস্ততার বাইরে ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি বেশ ঘরোয়া। অবসর সময়টা পরিবার, সন্তান এবং নিজের বাড়ির পরিবেশের মধ্যেই কাটাতে ভালোবাসেন। গাছপালা পরিচর্যা করা তার বিশেষ পছন্দের একটি কাজ। পাশাপাশি মাঝে মাঝে রান্না করা বা ছোটখাটো হ্যান্ডক্র্যাফট নিয়েও সময় কাটান। নিজেকে তিনি একজন ‘হোমলি পারসন’ হিসেবেই দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও ভাবনা রয়েছে তার। তিনি ফ্যাশনভিত্তিক এক্সোটিক ফটোগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে কিছু বিশেষ কাজ করার পরিকল্পনা করছেন। এ ধরনের কিছু প্রজেক্ট ইতোমধ্যে ভাবনায় আছে, তবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই সেগুলো বাস্তবায়ন করতে চান।
মডেলিং জগতে সফল হতে হলে কয়েকটি গুণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মারিয়া কিসপট্টা। তার মতে, প্রথমত নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে জেদ ও দৃঢ়তা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা এবং সিনিয়রদের প্রতি সম্মানবোধ থাকতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফোকাস ধরে রাখা। কারণ ফ্যাশন জগৎ খুবই রঙিন এবং আকর্ষণীয়; এখানে সহজেই মনোযোগ বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ থাকে। সেই সঙ্গে ধৈর্যও খুব জরুরি। ধৈর্য না থাকলে এই অঙ্গনে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা কঠিন।
দর্শকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এই মডেল। তার ভাষায়, যারা দীর্ঘদিন ধরে তাকে ভালোবাসা ও সমর্থন দিয়ে পাশে থেকেছেন, তাদের কারণেই তিনি কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পান। অনেক সময় সবকিছু ছেড়ে দিতে ইচ্ছে হলেও ভক্তদের ভালোবাসাই তাকে নতুন করে শক্তি জুগিয়েছে। তাই তিনি চান, যারা তাকে ভালোবাসেন তারা যেন ভবিষ্যতেও একইভাবে পাশে থাকেন এবং কোনো ভুল হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন।