বিশ্ববরেণ্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের : বাংলার বৌদ্ধ জাগরণের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক

প্রকাশিত: ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৩, ২০২৬

লেখক – লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া

বাংলাদেশের বৌদ্ধ সমাজের ইতিহাসে যে ক’জন মহাপুরুষ তাঁদের কর্ম, ত্যাগ ও প্রজ্ঞার দীপ্তিতে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন- তাঁদের অগ্রভাগে স্থান করে নিয়েছেন মহামান্য মহাসংঘনায়ক শ্রীসদ্ধর্মভাণক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের (বড়ভান্তে)। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সমাজ, সদ্ধর্ম ও মানবতার কল্যাণে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদন করেছিলেন। অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীকে আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক জাগরণের অগ্রদূত।
১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি, চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার পূর্বগুজরা হোয়ারাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শশাংক বড়ুয়া নামে এক শুভ্রশিশু। পিতা কর্মধন বড়ুয়া ও মাতা চিন্তাবতী বড়ুয়ার স্নেহধন্য সেই সন্তানই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন বাঙালি বৌদ্ধ সমাজের আলোকবর্তিকা। শৈশবেই পিতৃহারা হয়ে তিনি পিতৃব্য সংঘনায়ক সৌগতসূর্য অগ্রসার মহাস্থবিরের স্নেহ-শাসনে বেড়ে ওঠেন। সুদর্শন বিহার ও সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা এবং সন্ন্যাস জীবনের বীজ রোপিত হয় গুরুদেবের সান্নিধ্যে। কৈশোরেই তাঁর দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে এবং পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিকামী জনতার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত অগ্রসার ও ধর্মরাজিক মহাবিহারে আশ্রয় ও সহায়তা প্রদান করে তিনি মানবতার অনন্য নজির গড়েন।
১৯২৫ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং ‘শ্রী বিশুদ্ধানন্দ’ নাম লাভ করেন। ১৯৩০ সালে উপসম্পদা গ্রহণের মাধ্যমে ‘বিশুদ্ধানন্দ ভিক্ষু’ হিসেবে পরিচিতি পান। উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তিনি শ্রীলঙ্কার বিদ্যলঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে সর্বোচ্চ ‘শ্রীসদ্ধর্মভাণক’ উপাধি অর্জন করেন, যা তাঁর প্রজ্ঞা ও সাধনার স্বীকৃতি।
দেশে ফিরে তিনি সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘অগ্রসার মেমোরিয়াল সোসাইটি’, যা পরবর্তীকালে অগ্রসার মহাকমপ্লেক্সে রূপ নেয়। এর অধীনে গড়ে ওঠে অনাথালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা সেবা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, গার্মেন্টস, গবেষণা ও প্রকাশনা কার্যক্রমসহ বহুমাত্রিক মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগ। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে এ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও স্বীকৃতি লাভ করে।
অগ্রসার মহাকমপ্লেক্সে ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আগমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে স্মরণীয়। এই সফরে রাষ্ট্রপতি মহাথেরকে দেশের একজন বেসরকারি রাষ্ট্রদূত হিসেবে অভিহিত করেন এবং মহাকমপ্লেক্সের বিভিন্ন মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। এছাড়া ১৯৮৮ সালে ফ্রান্সের ফাস্ট লেডী মাদাম ডানিয়েন্স মিতেরা অগ্রসারে আগমন শুধু মহাথেরের কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি নয়, বরং বাংলাদেশের বৌদ্ধ সমাজের গুরুত্ব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রদর্শনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ, যা স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘথ নামে পরিচিত হয়। তিনি আমৃত্যু এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫০ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বৌদ্ধ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে তিনি আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং বিশ্ব বৌদ্ধ সৌভ্রাতৃত্ব সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন। ঢাকার কমলাপুরে ১৯৬০ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক ধর্মীয় ও মানবকল্যাণ কেন্দ্র। এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত ধর্মরাজিক অনাথালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হাজারো শিশুর জীবন আলোকিত করেছে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বৌদ্ধ সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অর্জনে মহামান্য মহাসংঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের ছিলেন এক অনন্য স্থপতি। তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও নিরলস প্রচেষ্টায় গঠিত বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট-এর প্রতিষ্ঠাকালীন ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কল্যাণ, অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন। তাঁর প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্বে বৌদ্ধ সমাজ নতুন আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পায়। তাঁর অসামান্য অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ এবং বাঙালি বৌদ্ধ সমাজ আন্তর্জাতিক মর্যাদায় ১৯৭৫ সালে জন্মজয়ন্তী, ১৯৮৪ সালে হিরক জন্মজয়ন্তী, ১৯৮৫ সালে পুনর্মিলনী এবং ১৯৯০ সালে প্লাটিনাম জন্মজয়ন্তী মহাসমারোহে উদযাপন করে। এসব ঐতিহাসিক আয়োজনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ, বিদেশি কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি ও দেশ-বিদেশের প্রাজ্ঞ পণ্ডিতগণ উপস্থিত থেকে তাঁকে অভিহিত করেন- ”এ যুগের বোধিসত্ত্ব”, ”বাংলার নব অতীশ” এবং ”ভ্রাম্যমাণ রাষ্ট্রদূত” হিসেবে। বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তাঁর নিরলস ভূমিকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসে একাধিক সম্মাননায়। ১৯৯০ সালে এশীয় বৌদ্ধ শান্তি সম্মেলন সংস্থা তাঁকে ”শান্তি সুবর্ণ পদক” প্রদান করে এবং ১৯৯৩ সালে নরওয়ের গান্ধী পীস ফাউন্ডেশন আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করেন। তাঁর জীবনদর্শন ছিল ধর্মের মর্মবাণীকে মানবকল্যাণে প্রয়োগ করা; বিভাজনের নয়, ঐক্যের পথ রচনা করা। তাঁর মহাপ্রয়াণের পরও রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর মর্যাদা অম্লান থাকে। তাঁর মহাপ্রয়াণ পরবর্তী ১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বিশেষ ”স্মারক খাম” প্রকাশ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। ২০০৫ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জাতীয় পুরস্কার একুশে পদক (মরণোত্তর) প্রদান করে জাতীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। ২০০৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগও তাঁকে বিশ্বের স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে।
বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরর অমর স্মৃতিকে চিরজাগরুক রাখতে তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী সুমিত্তানন্দ থেরর তত্ত্বাবধানে ২০১৯ সালে অগ্রসার মহাকমপ্লেক্স, মহাবোধি সংলগ্ন শ্মশান বেদিতে ৮১০০ বর্গফুট আয়তনের এক নান্দনিক, শিল্পসমৃদ্ধ স্মৃতিমন্দির নির্মাণকাজ শুরু হয়। করোনা মহামারি, অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘ প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে অবশেষে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে; এখন তা আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের প্রতীক্ষায়। এই স্মৃতিমন্দির কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি এক মহাপুরুষের কর্মময় জীবনের জীবন্ত দলিল, তাঁর আদর্শ, ত্যাগ ও মানবপ্রেমের অক্ষয় প্রতীক। যুগে যুগে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, তাঁর জীবনালোক বাঙালি বৌদ্ধ সমাজকে সত্য, শীল, প্রজ্ঞা ও মানবতার পথে অনুপ্রাণিত করে যাবে।
১৯৯৪ সালের ২ মার্চ তিনি ৮৬ বছর বয়সে মহাপ্রয়াণ করেন। ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মর্যাদায় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয় জন্মভূমি হোয়ারাপাড়ার অগ্রসার কমপ্লেক্সের তাঁরই স্বপ্নের ঠিকানায়। কর্মযোগে দীপ্ত এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ কেবল একজন সংঘনায়ক নন; তিনি ছিলেন মানবতার মূর্ত প্রতীক, সমাজসংস্কারক, শিক্ষাব্রতী ও শান্তির দূত। বাঙালি বৌদ্ধ সমাজ তাঁর কাছে চিরঋণী। তাঁর জীবন ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সত্য, শীল ও প্রজ্ঞার পথে অনুপ্রাণিত করে যাবে অনন্তকাল।

লেখক পরিচিতি : কলাম লেখক ও সংগঠক।