সে কোনো ধর্মগ্রন্থ বহন করে না, কোনো বাণী উচ্চারণ করে না- তবুও তার প্রতিটি পদচারণায় ছড়িয়ে পড়ে শান্তির অনুরণন।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান প্রত্যয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দীর্ঘ পদযাত্রায় নীরব সঙ্গী হয়ে হাঁটছে একটি কুকুর। তার নাম আলোকা (Aloka)। সাধারণ জন্ম হলেও তার উপস্থিতি অসাধারণ। বিস্তৃত আমেরিকার পথ ধরে ভিক্ষুদের পাশে পাশে হাঁটা এই প্রাণীটি আজ হয়ে উঠেছে করুণা, সহনশীলতা ও মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতীক।
পশুযোনিতে জন্ম নিয়েও আলোকা যেন ভয়ের ঊর্ধ্বে। তার চোখে নেই কোনো লোভ, নেই কোনো অস্থিরতা। আছে শুধু নিঃশর্ত বিশ্বাস, গভীর স্থিরতা আর এক প্রশান্ত নীরবতা, যা ভাষার সীমা অতিক্রম করে সরাসরি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, নীরব সাধনা আর কঠিন বাস্তবতার মাঝেও সে হয়ে উঠেছে ভিক্ষুদের অবিচ্ছেদ্য সহযাত্রী। যে কথা বলে না, অথচ যার উপস্থিতিই মনকে শান্ত করে দেয়।
এই দৃশ্য আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, করুণা কোনো প্রজাতির গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। মানুষ হোক বা জীবজন্তু, যে হৃদয়ে দয়া বাস করে, সেই হৃদয়ই প্রকৃত অর্থে মহৎ।
সংসারচক্রের দীর্ঘ অভিযাত্রায় অসংখ্য সুকর্মের ছায়া যেন আলোকাকে এনে দিয়েছে এই কোমল ও শান্ত স্বভাব। তার নীরব পদচারণায় যেন প্রতিধ্বনিত হয় বুদ্ধের চিরন্তন বাণী—“জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।”
জন্মের রূপ আলাদা হতে পারে, কিন্তু অনুভূতি এক। ভালোবাসা এক। শান্তির আকাঙ্ক্ষাও এক। আলোকা সেই সত্যের নীরব সাক্ষ্য। সে দেখিয়ে দেয় আধ্যাত্মিক মহত্ত্ব কোনো পরিচয়পত্রে লেখা থাকে না; তা প্রকাশ পায় আচরণে, সহানুভূতিতে আর নিঃশব্দ সান্নিধ্যে। পথকুকুর থেকে শান্তির প্রতীক একসময় সাধারণ এক পথকুকুর ছিল আলোকা। ভারতে শুরু হওয়া তার যাত্রা আজ আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সঙ্গে পথচলায় সে আজ আর কেবল একটি প্রাণী নয়, সে শান্তি, করুণা ও মানবিকতার প্রতীক।
যাত্রাপথে আলোকা’র স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পশুচিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন হলে সে বিশ্রাম নেয়, নিজের স্বাভাবিক ছন্দে পথচলা চালিয়ে যায়। ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ভিক্ষুরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “Aloka the Peace Dog” আলোকা দ্যা পিচ ডগ নামে একটি পেজ চালু করেন, যা ইতোমধ্যেই চার লাখেরও বেশি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে। পথে পথে মানুষ আলোকাকে ভালোবাসায় সিক্ত করছে খাবার, খেলনা আর স্নেহ দিয়ে। তার উপস্থিতি যেন মানুষকে নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে মানবিকতার সহজ অথচ গভীর সত্য।
আজ আলোকা ভিক্ষুদের সঙ্গে হাঁটে মর্যাদা নিয়ে, সচেতনতা নিয়ে, আর এক গভীর প্রশান্ত সৌন্দর্য নিয়ে। সে নিঃশব্দে বলে যায় শান্তি শেখাতে শব্দের প্রয়োজন হয় না; করুণা থাকলেই যথেষ্ট।
লেখক পরিচিতি : লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া,
সেক্রেটারী,লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট